খলিফা / খিলাফত :
৬৪. এর দুটি অর্থ হতে পারে। এক, পূর্ববর্তী প্রজন্ম ও জাতিদের অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁরপর এই
পৃথিবীর বুকে তিনি তেমাদেরকে তাদের জায়গায় স্থাপন
করেছেন। দুই, তিনি পৃথিবীতে
তোমাদেরকে বিভিন্ন জিনিস ব্যবহার করার যে ক্ষমতা দিয়েছেন তা
তোমাদের এ জিনিসগুলোর মালিক হবার কারণে নয় বরং মূল মালিকের
প্রতিনিধি হিসেবে তোমাদের এগুলো ব্যবহার করার ক্ষমতা দিয়েছেন।
শীঘ্রই তোমাদের রব তোমাদের শত্রুকে ধ্বংস করে দেবেন এবং
পৃথিবীতে তোমাদের খলীফা করবেন, তারপর তোমরা কেমন কাজ করো তা তিনি দেখবেন৷-৭:১২৯
খিলাফত শব্দের অর্থ কি ? খিলাফত তথা ইসলামী রাষ্ট্রক্ষমতা আল্লাহ কাদেরকে দিবেন :
(নুর: ৫৫) আল্লাহ
প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে
যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত দান
করবেন যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে দান করেছিলেন, তাদের জন্য তাদের
দীনকে মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, যাকে আল্লাহ তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের
(বর্তমান) ভয়-ভীতির অবস্থাকে
নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন ৷ তারা শুধু আমার বন্দেগী করুক এবং আমার সাথে কাউকে
যেন শরীক না করে৷৮৩ আর যারা এরপর কুফরী করবে তারাই ফাসেক ৷
৮৩ . এ বক্তব্যের শুরুতেই আমি ইংগিত করেছি, এ উক্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে মুনাফিকদেরকে এ মর্মে সতর্ক করা যে, আল্লাহ মুসলমানদের খিলাফত দান করার যে, প্রতিশ্রুতি দেন তা নিছক আদম শুমারীর
খাতায় যাদের নাম মুসলমান হিসেবে লেখা হয়েছে তাদের জন্য নয় বরং এমন মুসলমানদের জন্য যারা সাচ্ছা ঈমানদার, চরিত্র ও কর্মের দিক দিয়ে সৎ, আল্লাহর পছন্দনীয় দীনের আনুগত্যকারী এবং সব ধরনের
শিরক মুক্ত হয়ে নির্ভেজাল আল্লাহর বন্দেগী ও দাসত্বকারী। যাদের মধ্যে এসব গুণ নেই, নিছক মুখে ঈমানের
দাবীদার, তারা এ প্রতিশ্রুতিলাভের যোগ্য নয় এবং তাদের জন্য এ প্রতিশ্রুতি
দানও করা হয়নি। কাজেই তারা যেন এর অংশীদার হবার আশা না রাখে।
কেউ কেউ খিলাফতকে নিছক রাষ্ট্র ক্ষমতা, রাজ্য শাসন, প্রাধান্য ও
প্রতিপত্তি অর্থে গ্রহণ করেন। তারপর আলোচ্য আয়াত থেকে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌছেন যে, দুনিয়ায় যে ব্যক্তিই এ শক্তি
অর্জন করে সে মু'মিন, সৎ, আল্লাহর পছন্দনীয় দীনের অনুসারী, আল্লাহর বন্দেগী ও দাসত্বকারী এবং শিরক থেকে দূরে
অবস্থানকারী। এরপর তারা নিজেদের এ ভুল সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রতিপন্ন করার
জন্য ঈমান, সৎকর্মশীলতা, সত্যদীন, আল্লাহর ইবাদাত ও শির্ক তথা প্রত্যেকটি জিনিসের
অর্থ বিকৃত করে তাকে এমন কিছু বানিয়ে দেন যা তাদের এ
মতবাদের সাথে খাপ খেয়ে যায়। এটা কুরআনের
নিকৃষ্টতম অর্থগত বিকৃতি। এ বিকৃতি ইহুদী ও খৃষ্টানদের বিকৃতিকেও
ম্লান করে দিয়েছে। এ বিকৃতির মাধ্যমে কুরআনের একটি আয়াত এমন একটি অর্থ করা হয়েছে যা
সমগ্র কুরআনের শিক্ষাকে বিকৃত করে দেয় এবং ইসলামের কোন একটি
জিনিসকেও তার স্বস্থানে প্রতিষ্ঠিত থাকতে দেয় না। খিলাফতের এ সংজ্ঞা বর্ণনা
করার পর নিশ্চিতভাব এমন সব লোকের ওপর এ আয়াত প্রযোজ্য হয় যারা কখনো দুনিয়ায় প্রাধান্য ও রাষ্ট্রক্ষমতা লাভ
করেছে অথবা বর্তমানে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে। তারা আল্লাহ, অহী, রিসালাত, আখেরাত সবকিছু
অস্বীকারকারী হতে পারে এবং ফাসেকী ও অশ্লীলতার
এমন সব মলিনতায় আপ্লুতও হতে পারে যেগুলোকে কুরআন কবীরা গুনাহ তথা বৃহৎ পাপ গণ্য করেছে, যেমন সুদ, ব্যভিচার, মদ, জুয়া। এখন যদি এসব লোক
সৎ মুমিন হয়ে থাকে এবং এ জন্যই তাদেরকে খিলাফতের
উন্নত আসনে অধিষ্ঠতি করা হয়ে থাকে, তাহলে এরপর ঈমানের অর্থ প্রাকৃতিক আইন মেনে নেয়া
এবং সৎকর্মশীলতা অর্থ এ আইনগুলোক সাফল্যের সাথে
ব্যবহার করা ছাড়া আর কি হতে পারে৷ আর আল্লাহর পছন্দনীয় দীন বলতে প্রাণী বিদ্যা, পদার্থ বিদ্যা ও জ্যোতিবিদ্যা পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ করে শিল্প, কারিগরী, বাণিজ্য ও
রাজনীতিতে ব্যাপক উন্নতি লাভ করা ছাড়া আর কি হতে পারে৷ এরপর আল্লাহর বন্দেগী বলতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রচেষ্টা ও
সংগ্রামে সাফল্য লাভ করার জন্য যেসব নিয়ম
কানুন মেনে চলা প্রকৃতিগতভাবে লাভজনক ও অপরিহার্য হয়ে থাকে সেগুলো মেনে চলা ছাড়া আর কি হতে পারে৷ তারপর এ
লাভজনক নিয়ম কানুনের সাথে কোন ব্যক্তি বা জাতি কিছু ক্ষতিকর
পদ্ধতি অবলম্বন করলে তাকেই শির্ক নামে অভিহিত করা ছাড়া আর কাকে শির্ক বলা যাবে৷ কিন্তু যে ব্যক্তি কখনো
দৃষ্টি ও মন আচ্ছন্ন না রেখে বুঝে কুরআন পড়েছে সে কি কখনো
একথা মেনে নিতে পারে যে, সত্যিই কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী ঈমান, সৎকাজ, সত্য দীন, আল্লাহর ইবাদাত এবং তাওহীদ ও শির্কের এ অর্থই হয়৷ যে
ব্যক্তি কখনো পুরো কুরআন বুঝে পড়েনি এবং
কেবলমাত্র বিচ্ছিন্ন কিছু আয়াত নিয়ে সেগুলোকে নিজের চিন্তা-কল্পনা ও মতবাদ অনুযায়ী সাজিয়ে নিয়েছে সে-ই কেবল এ
অর্থ গ্রহণ করতে পারে। অথবা এমন এক
ব্যক্তি এ কাজ করতে পারে, যে কুরআন পড়ার সময় এমন সব আয়াতকে
একেবারেই অর্থহীন ও ভুল মনে করেছে যেগুলোতে
আল্লাহকে একমাত্র রব ও ইলাহ, তাঁর নাযিল করা অহীকে পথনির্দেশনার একমাত্র উপায় এবং
তাঁর পাঠানো প্রত্যেক নবীকে চূড়ান্ত পর্যায়ে অপরিহার্যভাবে মেনে নেবার ও নেতা বলে স্বীকার করে অনুসরণ
করার আহবান জানানো হয়েছে। আর এই সংগে
বর্তমান দুনিয়াবী জীবনের শেষে দ্বিতীয় আর একটি জীবন কেবল মেনে নেবারই দাবী করা হয়েনি বরং একথাও পরিষ্কার বলে
দেয়া হয়েছে যে, যারা এ জীবনে নিজেদের জবাবদিহির কথা অস্বীকার করে বা এ
ব্যাপারে সকল প্রকার চিন্তা বিমুক্ত হয়ে নিছক এ দুনিয়ায় সাফল্য লাভের উদ্দেশ্যে কাজ করবে তারা চূড়ান্ত
সাফল্য থেকে বঞ্চিত থাকবে। কুরআনে এ বিষয়বস্তুগুলো এত বেশী পরিমাণে, বিভিন্ন পদ্ধতিতে এবং সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বারবার বলা হয়েছে যে, খিলাফত লাভ সম্পর্কিত এ আয়াতের এ নতুন ব্যাখ্যা দাতাগণ এ ব্যাপারে যে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন, যথার্থ সততা ও আন্তরিকতার সাথে এ কিতাব পাঠকারী কোন ব্যক্তি কখনো তার শিকার হতে পারেন, একথা মেনে নেয়া আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ খিলাফত ও
খিলাফত লাভের যে অর্থের ওপর তারা নিজেদের চিন্তার এ বিশাল ইমারত নির্মাণ করেছেন তা তাদের নিজেদের তৈরী। কুরআনের জ্ঞান রাখে এমন কোন ব্যক্তি কখনো এ আয়াতের এ অর্থ করতে পারেন না।
আসলে কুরআন খিলাফত ও খিলাফত
লাভকে তিনটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করে। প্রত্যেক জায়গায় পূর্বাপর আলোচ্য বিষয়
থেকে কোথায় এ শব্দটি কি অর্থে বলা হয়েছে তা জানা যায়।
এর একটি অর্থ হচ্ছে, ''আল্লাহর দেয়া ক্ষমতার অধিকারী
হওয়া।'' এ অর্থ
অনুসারে সারা দুনিয়ার সমস্ত মানব
সন্তান পৃথিবীতে খিলাফতের আসনে অধিষ্ঠিত।
দ্বিতীয় অর্থটি হচ্ছে, ''আল্লাহর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব
মেনে নিয়ে তাঁর শরীয়াতী বিধানের
(নিছক প্রাকৃতিক বিধানের নয়) আওতায় খিলাফতের ক্ষমতা ব্যবহার করা।'' এ অর্থে কেবল মাত্র সৎ মুমিনই খলীফা
গণ্য হয়। কারণ সে সঠিকভাবে খিলাফতের হক
আদায় করে। বিপরীত
পক্ষে কাফের ও ফাসেক খলীফা নয় বরং বিদ্রোহী । কারণ তারা আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতাকে নাফরমানীর পথে
ব্যবহার করে ।
তৃতীয় অর্থ হচ্ছে, ''এক যুগের বিজয়ী ও ক্ষমতাশালী
জাতির পরে অন্য জাতির তার স্থান
দখল করা।'' খিলাফতের
প্রথম দু'টি অর্থ গৃহীত হয়েছে ''প্রতিনিধিত্ব''। শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ থেকে। আর এ শেষ অর্থটি ''স্থলাভিষিক্ত''। শব্দ
থেকে নেয়া হয়েছে। এ শব্দটির এ দু'টি অর্থ আরবী ভাষায় সর্বজন
পরিচিত।
এখন যে ব্যক্তিই এখানে এ প্রেক্ষাপটে
খিলাফতলাভের আয়াতটি পাঠ করবে সে এক মুহূর্তের জন্যও এ
ব্যাপারে সন্দেহ পোষন করতে পারে না যে, এখানে খিলাফত
শব্দটি এমন এক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অর্থে ব্যবহৃত
হয়েছে, যা আল্লাহর শরীয়াতী বিধান অনুযায়ী (নিছক প্রাকৃতিক বিধান অনুযায়ী নয়) তাঁর
প্রতিনিধিত্বের যথাযথ হক আদায় করে। এ কারণেই কাফের তো দূরের কথা ইসলামের দাবীদার
মুনাফিকদেরকেও এ প্রতিশ্রুতিতে শরীক করতে অস্বীকৃতি জানানো
হচ্ছে। তাই বলা হচ্ছে,একমাত্র ঈমান ও সৎকর্মের গুণে গুণান্বিত লোকেরাই হয় এর অধিকারী। এ জন্য খিলাফত প্রতিষ্ঠার ফল হিসেবে বলা হচ্ছে, আল্লাহর পছন্দনীয় দীন
অর্থাৎ ইসলাম মজবুত বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত আল্লাহর বন্দেগীর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। এ বন্দগীতে যেন শিরকের সামান্যতমও মিশেল না থাকে। এ প্রতিশ্রুতিকে এখান থেকে উঠিয়ে
নিয়ে আন্তর্জাতিক ময়দানে পৌঁছিয়ে দেয়া এবং আমেরিকা থেকে নিয়ে রাশিয়া পর্যন্ত যারই শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রতাপ-প্রতিপত্তির ডংকা
দুনিয়ায় বাজতে থাকে তারই সমীপে এক নজরানা
হিসেবে পেশ করা চূড়ান্ত মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ শক্তিগুলো যদি খিলাফতের উচ্চ পদে
অধিষ্ঠিত থেকে থাকে তাহলে ফেরাউন ও নমরূদ কি দোষ করেছিল, আল্লাহ কেন তাদেরকে
অভিশাপলাভের যোগ্য গণ্য করেছেন৷ (আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, আল আম্বিয়া, ৯৯ টিকা)।
এখানে আর একটি কথাও উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালের মুসলমানদের জন্য এ প্রতিশ্রুতি পরোক্ষভাবে পৌঁছে যায়। প্রত্যক্ষভাবে এখানে এমন সব লোককে সম্বোধন করা হয়েছিল যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের
যুগে ছিলেন। প্রতিশ্রুতি যখন দেয়া হয়েছিল তখন সত্যিই মুসলমানরা ভয়-ভীতির মধ্যে
অবস্থান করছিল এবং দীন ইসলাম তখনো হিজাযের সরেজমিনে
মজবুতভাবে শিকড় গেড়ে বসেনি। এর কয়েক বছর পর এ
ভয়ভীতির অবস্থা কেবল নিরাপত্তায় বদলে
যায়নি বরং ইসলাম আরব থেকে হয়ে এশিয়া ও আফ্রিকার বৃহত্তর অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তার শিকার কেবল তার জন্মভূমিতেই
নয়, বহির্বিশ্বেও মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। আল্লাহর তাঁর এ প্রতিশ্রুতি আবু বকর সিদ্দীক, উমর ফারুক ও উসমান গণী রাদিয়াল্লাহু আনহুমের জামানায় পুরা করে
দেন, এটি একথার একটি ঐতিহাসিক প্রমাণ। এরপর এ তিন মহান ব্যক্তির
খিলাফতকে কুরআন নিজেই সত্যায়িত করেছে এবং আল্লাহ নিজেই এদের সৎমুমিন হবার সাক্ষ দিচ্ছেন, এ ব্যাপারে কোন
ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তির পক্ষে সন্দেহ পোষন করা কঠিন। এ ব্যাপারে যদি কারোর মনে সন্দেহ দেখা দেয় তাহলে তাঁর ''নাহ্জুল বালাগায়' সাইয়েদুনা হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর ভাষন পাঠ করা দরকার। হযরত উমরকে ইরানীদের বিরুদ্ধে
সশরীরে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য তিনি এ ভাষণটি দিয়েছিলেন। এতে তিনি বলেনঃ এ কাজের বিস্তার বা দুর্বলতা সংখ্যায় বেশী
হওয়া ও কম হওয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। এ হচ্ছে আল্লাহর দীন। তিনি একে বিস্তৃত
ও সম্প্রসারিত করেছেন। আর আল্লাহর সেনাদলকে তিনি সাহায্য-সহায়তা দান করেছেন। শেষ পর্যন্ত উন্নতি লাভ করে তা এখানে
পৌঁছে গেছে। আল্লাহ নিজেই আমাদের বলেছেনঃ
-----
আল্লাহ নিশ্চয়ই এ প্রতিশ্রুতি পূর্ণ
করবেন এবং নিশ্চয়ই নিজের সেনানীদেরকে সাহায্য করবেন। মোতির মালার মধ্যে সূতোর যে স্থান,ইসলামে কাইয়েম তথা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাকারীও সে একই স্থানে অবস্থান করছেন। সূতো ছিড়ে গেলেই মোতির দানাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং শৃংখলা বিনষ্ট হয়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর আবার একত্র হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে সন্দেহ নেই, আরবরা সংখ্যায় অল্প। কিন্তু ইসলাম
তাদেরকে বিপুল সংখ্যায় পরিণত করেছে এবং
সংঘবদ্ধতা তাদেরকে শক্তিশালী করে দিয়েছে। আপনি কেন্দ্রীয়
পরিচালক হিসেবে এখানে শক্ত হয়ে বসে থাকুন, আরবের যাঁতাকে নিজের চারদিকে ঘুরাতে থাকুন এবং এখানে বসে বসেই যুদ্ধের আগুন জ্বালাতে
থাকুন। নয়তো আপনি যদি একবার এখান থেকে সরে যান তাহলে সবদিকে আরবীয় ব্যবস্থা ভেঙ্গে
পড়তে শুরু করবে এবং অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে পৌছুবে যে, আপনাকে সামনের শত্রুর তুলনায় পেছনের বিপদের কথা বেশী করে
চিন্তা করতে হবে। আবার ওদিকে ইরানীরা আপনার ওপর দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত করবে। তারা মনে করবে, এই তো আরবের মূল গ্রন্থী, একে কেটে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। কাজেই আপনাকে খতম করে দেবার জন্য তারা নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। আর আজমবাসীরা এসময় বিপুল সংখ্যায় এসে ভীড় জমিয়েছে বলে যে কথা আপনি বলেছেন এর জবাবে
বলা যায়, এর আগেও আমরা তাদের সাথে লড়েছি, তখনো সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে লড়িনি বরং আল্লাহর সাহায্য ও
সহায়তাই আজ পর্যন্ত আমাদের সফলকাম
করেছে।''
জ্ঞানী পর্যবেক্ষক নিজেই দেখতে পারেন
হযরত আলী (রা) এখানে কাকে খিলাফতলাভের ক্ষেত্র হিসেবে
গণ্য করছেন।
(বিস্তারিত দেখুন : র > রাষ্ট্রক্ষমতা )
“আমানত” শব্দের অর্থ যেখানে খিলাফত :
(৩৩-আহযাব: ৭২) আমি এ আমানতকে
আকাশসমূহ, পৃথিবী ও পর্বতরাজির ওপর পেশ করি, তারা একে বহন করতে রাজি হয়নি এবং তা
থেকে ভীত হয়ে পড়ে৷ কিন্তু মানুষ একে বহন করেছে, নিসন্দেহে সে বড় জালেম ও অজ্ঞ৷১২০ ৭৩) এ আমানতের বোঝা উঠাবার
অনির্বায ফল হচ্ছে এই যে, আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও নারী এবং মুশরিক পুরুষ ও নারীদেরকে সাজা দেবেন এবং মু’মিন পুরুষ ও নারীদের তাওবা কবুল করবেন, আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷
১২০. বক্তব্য শেষ করতে গিয়ে আল্লাহ মানুষকে এ চেতনা দান করতে
চান যে, দুনিয়ায় সে কোন ধরনের মর্যাদার অধিকারী এবং এ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থেকে
যদি সে দুনিয়ার জীবনকে নিছক একটি খেলা মনে করে নিশ্চিন্তে
ভুল নীতি অবলম্বন করে, তাহলে কিভাবে স্বহস্তে নিজের ভবিষ্যত
নষ্ট করে।
এ স্থানে "আমানত" অর্থ সেই
"খিলাফতই" যা কুরআন মজীদের দৃষ্টিতে মানুষকে দুনিয়ায় দান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ মানুষকে আনুগত্য ও অবাধ্যতার যে স্বাধীনতা দান
করেছেন এবং এ স্বাধীনতা ব্যবহার করার জন্য তাকে
অসংখ্য সৃষ্টির ওপর যে কর্তৃত্ব ক্ষমতা দিয়েছেন। তার অনিবার্য ফল স্বরূপ মানুষ নিজেই নিজের স্বেচ্ছাকৃত
কাজের জন্য দায়ী গণ্য হবে এবং নিজের সঠিক কর্মধারার
বিনিময়ে পুরস্কার এবং অন্যায় কাজের বিনিময়ে শাস্তির অধিকারী
হবে। এসব ক্ষমতা যেহেতু মানুষ নিজেই অর্জন
করেনি বরং আল্লাহ তাকে দিয়েছেন এবং
এগুলোর সঠিক ও অন্যায় ব্যবহারের দরুন তাকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে, তাই কুরআন মজীদের
অন্যান্য স্থানে এগুলোকে খিলাফত শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে এবং এখানে এগুলোর জন্য আমানত শব্দ ব্যবহার করা
হয়েছে।
এ আমানত কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্বল সে
ধারণা দেবার জন্য আল্লাহ বলেন, আকাশ ও পৃথিবী তাদের সমস্ত শ্রেষ্ঠত্ব এবং পাহাড়
তার বিশাল ও বিপুলায়তন দেহাবয়ব ও গম্ভীরতা সত্ত্বেও তা বহন
করার শক্তি ও হিম্মত রাখতো না কিন্তু দূর্বল দেহাবয়বের অধিকারী মানুষ নিজের ক্ষুদ্রতম প্রাণের ওপর এ
ভারী বোঝা উঠিয়ে নিয়েছে।
পৃথিবী ও আকাশের সামনে আমানতের বোঝা পেশ
করা এবং তাদের তা উঠাতে অস্বীকার করা এবং ভীত হওয়ার
ব্যাপারটি হতে পারে শাব্দিক অর্থেই সংঘটিত হয়েছে। আবার এও হতে পারে যে, একথাটি রূপকের ভাষায় বলা হয়েছে। নিজের সৃষ্টির সাথে আল্লাহর যে সম্পর্ক রয়েছে তা আমরা জানতেও পারি না এবং বুঝতেও পারি
না। পৃথিবী, চাঁদ, সূর্য ও পাহাড় যেভাবে আমাদের কাছে বোবা, কালা ও প্রাণহীন, আল্লাহর কাছেও যে তারা ঠিক তেমনি হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। আল্লাহ নিজের প্রত্যেক সৃষ্টির সাথে কথা বলতে পারেন এবং সে
তার জবাব দিতে পারে। এর প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করার ক্ষমতা আমাদের বুদ্ধি ও
বোধশক্তির নেই। তাই এটা পুরোপুরিই
সম্ভব যে, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ নিজেই এ বিরাট বোঝা
তাদের সামনে পেশ করে থাকবেন এবং তারা তা দেখে কেপে
উঠে থাকবে আর তারা তাদের প্রভু ও স্রষ্টার কাছে এ নিবেদন পেশ
করে থাকবে যে, আমরা তো আপনারই ক্ষমতাহীন সেবক হয়ে
থাকার মধ্যেই নিজেদের মংগল দেখতে পাই। নাফরমানী করার স্বাধীনতা নিয়ে তার হক আদায় করা এবং হক আদায় না করতে পারলে তার শাস্তি বরদাশত করার
সাহস আমাদের নেই। অনুরূপভাবে এটাও সম্ভব, আমাদের বর্তমান জীবনের পূর্বে আল্লাহ সমগ্র মানব জাতিকে
অন্য কোন ধরনের একটি অস্তিত্ব দান করে
নিজের সামনে হাজির করে থাকবেন এবং তারা নিজেরাই এ দায়িত্ব বহন করার আগ্রহ প্রকাশ করে থাকবেন। একথাকে অসম্ভব গণ্য করার জন্য কোন যুক্তি আমাদের কাছে নেই। একে সম্ভাবনার গন্ডীর বাইরে রাখার ফায়সালা সেই ব্যক্তিই
করতে পারে যে নিজের চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতার
ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছে।
তবে এ বিষয়টাও সমান সম্ভবপর যে, নিছক রূপকের আকারে আল্লাহ এ বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন এবং অবস্থার অস্বাভাবিক গুরুত্বের
ধারণা দেবার জন্য এমনভাবে তার নকশা পেশ করা হয়েছে যেন
একদিকে পৃথিবী ও আকাশ এবং হিমালয়ের মতো গগণচুম্বী পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে আর অন্যদিকে দাঁড়িয়ে আছে ৫/৬ উচু লম্বা
একজন মানুষ। আল্লাহ জিজ্ঞেস করছেনঃ
"আমি আমার সমগ্র
সৃষ্টিকূলের মধ্যে কোন একজনকে এমন শক্তি দান করতে চাই যার ফলে আমার সার্বভৌম কর্তৃত্বের মধ্যে অবস্থান
করে সে নিজেই স্বেচ্ছায় ও সাগ্রহে আমার প্রাধান্যের
স্বীকৃতি এবং আমার হুকুমের আনুগত্য করতে চাইলে করবে অন্যথায় সে আমাকে অস্কীকার করতেও পারবে আর আমার বিরুদ্ধে
বিদ্রোহের ঝান্ডা নিয়েও উঠতে পারবে। এ স্বাধীনতা দিয়ে আমি তার কাছ থেক এমনভাবে
আত্মগোপন করে থাকবো যেন আমি কোথাও নেই। এ স্বাধীনতাকে কার্যকর করার জন্য আমি
তাকে ব্যাপক ক্ষমতা দান করবো, বিপুল যোগ্যতার অধিকারী করবো এবং নিজের
অসংখ্য সৃষ্টির ওপর তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করবো। এর ফলে বিশ্ব- জাহানে সে যা কিছু ভাংগা
গড়া করতে চায় করতে পারবে। এরপর একটি নির্দিষ্ট সময়ে আমি তার কাজের হিসেব
নেবো। যে আমার প্রদত্ত স্বাধীনতাকে ভুলপথে ব্যবহার করবে তাকে এমন শাস্তি দেবো যা কখনো
আমার কোন সৃষ্টিকে আমি দেইনি। আর যে নাফরমানীর সমস্ত সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও
আমার আনুগত্যের পথই অবলম্বন করে থাকবে তাকে এমন উচ্চ মর্যাদা
দান করবো যা আমার কোন সৃষ্টি লাভ করেনি। এখন বলো তোমাদের
মধ্য থেকে কে এ পরীক্ষাগৃহে প্রবেশ করতে
প্রস্তুত আছে৷
এ ভাষণ শুনে প্রথমে তো বিশ্ব-জগত নিরব
নিথর দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর একের পর এক এগিয়ে আসে। সকল প্রকান্ড অবয়ব
ও শক্তির অধিকারী সৃষ্টি এবং তারা হাটু গেড়ে বসে কান্নাজড়িত স্বরে সানুনয় নিবেদন করে যেতে থাকে তাদেরকে যেন
এ কঠিন পরীক্ষা থেকে মুক্ত রাখা যায়। সবশেষে এ একমুঠো মাটির তৈরি মানুষ ওঠে। সে বলে, হে আমার পওয়ারদিগার!আমি এ পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত। এ পরীক্ষায় সফলকাম হয় তোমার সালতানাতের সবচেয়ে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হবার যে আশা
আছে সে কারণে আমি এ স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারের
মধ্যে যেসব আশংকা ও বিপদাপদ রয়েছে সেগুলো অতিক্রম করে যাবো।
নিজের কল্পনাদৃষ্টির সামনে এ চিত্র তুলে
ধরেই মানুষ এই বিশ্ব জাহানে কেমন নাজুক স্থানে অবস্থান
করছে তা ভালোভাবেই আন্দাজ করতে পারে। এখন এ পরীক্ষাগৃহে
যে ব্যক্তি নিশ্চিন্তে বসে থাকে এবং কতবড় দায়িত্বের
বোঝা যে সে মাথায় তুলে নিয়েছে, আর দুনিয়ার জীবনে নিজের জন্য কোন নীতি নির্বাচন
করার সময় যে ফায়সালা সে করে তার সঠিক বা ভুল হবার ফল কি দাঁড়ায় তার কোন অনুভূতিই যার থাকে না তাকেই
আল্লাহ এ আয়াতে জালেম ও অজ্ঞ বলে অভিহিত
করছেন। সে অজ্ঞ, কারণ সেই বোকা
নিজেই নিজেকে অদায়িত্বশীল মনে করে নিয়েছে। আবার সে জালেম, কারণ সে নিজেই
নিজের ধ্বংসের ব্যবস্থা করছে এবং নাজানি নিজের সাথে সে
আরো কতজনকে নিয়ে ডুবতে চায়।
ইসলামে রাজতন্ত্রের অবস্থান কতটুকু :
(৩৮-সোয়াদ:২৬) (আমি তাকে
বললাম) “ হে দাউদ! আমি তোমাকে
পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি,
কাজেই তুমি জনগণের মধ্যে সত্য সহকারে শাসন কর্তৃত্ব পরিচালনা করো এবং প্রবৃত্তির
কামনার অনুসরণ করো না, কারণ তা তোমাকে
আল্লাহর পথ থেকে বিপরথগামী করবে৷ যারা আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী হয় অবশ্যই
তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি, যেহেতু তারা বিচার দিবসকে ভুলে গেছে৷” ২৮
২৮. তাওবা কবুল করার ও মর্যাদা বৃদ্ধির সুসংবাদ
দেবার সাথে সাথে মহান আল্লাহ সে সময় হযরত দাউদকে (আ ) এ সতর্কবাণী শুনিয়ে দেন। এ থেকে একথা আপনা আপনি প্রকাশ হয়ে যায় যে, তিনি যে কাজটি
করেছিলেন তাতে প্রবৃত্তির কামনার কিছু দখল ছিল, শাসন ক্ষমতার অসংগত ব্যবহারের সাথেও
তার কিছু সম্পর্ক ছিল এবং তা এমন কোন কাজ ছিল যা কোন ন্যায়নিষ্ঠ শাসকের
জন্য শোভণীয় ছিল না।
আরো দেখুন : র > রজতন্ত্র> ইসলামী
বিধান মতে রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে রাজতান্ত্রিক
শসন ব্যবস্থার প্রকৃত স্বরুপ কি ?
র > রাষ্ট্র।
=====================================
প্রশ্ন : ৫৬ : পবিত্র কুরআনে কতজন নবীর নাম রয়েছে ?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন