শনিবার, ৫ অক্টোবর, ২০১৯

কুরবানী



আরো দেখুন : > জবেহ > পশু জবেহ করার মাছআলাহ, > হজ্জ

পূর্ববর্তী শরীয়ত সমূহেও কুরবানী প্রচলিত ছিল তবে নিয়ম কানুন ছিল ভিন্ন রকম :

:২৭ (হাবিল কাবিলের ঘটনায়), :৯৭,

(হাজ্ব:৩৪) প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কুরবানীর একটি নিয়ম ঠিক করে দিয়েছি, যাতে (সে উম্মতের) লোকেরা সে পশুদের ওপর আল্লাহর নাম নেয় যেগুলো তিনি তাদেরকে দিয়েছেন৷৬৪    
 (৬৫. এ আয়াত থেকে জানা গেছে, আল্লাহর নামে কুরবানী করাই হচ্ছে আসল জিনিস কুরবানী কখন করা হবে, কোথায় করা হবে, কিভাবে করা হবে-এ নিয়মটির এ বিস্তারিত নিয়মাবলী মোটেই কোন মৌলিক বিষয় নয়বিভিন্ন যুগের, জাতির ও দেশের নবীদের শরীয়াতে অবস্থার প্রেক্ষিতে এ বিস্তারিত বিষয়াবলীতে পার্থক্য ছিলকিন্তু সবার মূল প্রাণশক্তি ও উদ্দেশ্য একই রয়েছে)

কুরবানীর বিধান সমূহ :

(হাজ্ব:২৮) ...এবং তিনি তাদেরকে যেসব পশু দান করেছেন তার উপর কয়েকটি নির্ধারিত দিনে আল্লাহর নাম নেয়৪৯ নিজেরাও খাও এবং দুর্দশাগ্রস্ত অভাবীকেও খাওয়াও৷৫০ 
(৪৯. পশু বলতে এখানে গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তুর কথা বলা হয়েছেঅর্থাৎ উট, গরু, ছাগল, ভেড়া, যেমন সূরা আন'আমের ১৪২-১৪৪ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে
তাদের উপর আল্লাহর নাম নেবার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর নামে এবং তাঁর নাম উচ্চারণ করে তাদেরকে যবেহ করা যেমন পরবর্তী বাক্য নিজেই বলে দিচ্ছেকুরআন মজীদে কুরবানীর জন্য সাধারণভাবে "পশুর উপর আল্লাহর নাম নেয়া"র পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়েছে এবং সব জায়গায়ই এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর নামে পশু যবেহ করাএভাবে যেন এ সত্যটির ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহর নাম না নিয়ে অথবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে পশুযবেহ করা কাফের ও মুশরিকদের পদ্ধতিমুসলমান যখনই পশু যবেহ করবে আল্লাহর নাম নিয়ে করবে এবং যখনই কুরবানী করবে আল্লাহর জন্য করবে
৫০. কেউ কেউ এ বক্তব্যের এ অর্থ গ্রহণ করেছেন যে, কুরবানীর পশুর গোস্ত খাওয়া ও খাওয়ানো উভয়টিই ওয়াজিব কারণ, এখানে আদেশ সূচক ক্রিয়াপদের মাধ্যমে হুকুম দেয়া হয়েছেঅন্য একটি দলের মতে, খাওয়া হচ্ছে মুস্তাহাব এবং খাওয়ানো ওয়াজিবইমাম মালিক (র) ও ইমাম শাফেঈ (র) এমত প্রকাশ করেছেনতৃতীয় দল বলেন, খাওয়া ও খাওয়ানো দু'টোই মুস্তাহাবখাওয়া মুস্তাহাব হবার কারণ হচ্ছে এই যে, জাহেলী যুগে লোকেরা নিজেদের কুরবানীর গোশত নিজেদের খাওয়া নিষেধ মনে করতোআর খাওয়ানো এজন্য পছন্দনীয় যে, এর মাধ্যমে গরীবদের সাহায্য ও সহযোগিতা করা হয়এটি ইমাম আবু হানীফার (র) মতহাসান বসরী, আত, মুজাহিদ ও ইবরাহীম নাখঈ থেকে ইবনে জারীর এ উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে, (আরবী) এর মধ্যে আদেশসূচক ক্রিয়াপদ ব্যবহারের কারণে খাওয়া ওয়াজিব প্রমাণিত হয় নাএ হুকুমটি ঠিক তেমনি যেমন বলা হয়েছে (আরবী) "যখন তোমরা ইহরামের অবস্থা থেকে বের হয়ে আসো তখন আবার শিকার করো" (আল-মায়েদাহঃ ২) এবং (আরবী) "তারপর যখন নামায শেষ হয়ে যায় তখন আবার পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ো ওয়াজিববরং এর অর্থ হচ্ছেঃ এরপর এসনটি করার পথে কোন বাধা নেইঅনুরূপভাবে এখানেও যেহেতু লোকেরা কুরবানীর গোশত নিজেদের খাওয়া নিষিদ্ধ মনে করতো তাই বলা হয়েছেঃ না, তা খাও অর্থাৎ এটা মোটেই নিষিদ্ধ নয়
দুর্দশাগ্রস্ত অভাবীকে আহার করানোর ব্যাপারে যা বলা হয়েছে তার অর্থ এ নয় যে, সচ্ছল বা ধনী ব্যক্তিকে আহার করানো যেতে পারে নাবন্ধু, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন অভাবী না হলেও তাদেরকে কুরবানীর গোশত দেওয়া জায়েযএ বিষয়টি সাহাবায়ে কেরামের কার্যাবলী থেকে প্রমাণিতআলকামা বলেন, হযরত আবুদল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) আমার হাতে কুরবানীর পশু পাঠান এবং নির্দেশ দেন, কুরবানীর দিন একে যবেহ করবে, নিজে খাবে, মিসকীনদেরকে দেবে এবং আমার ভাইয়ের ঘরে পাঠাবেইবনে উমরও (রা) একই কথা বলেছেন অর্থাৎ একটি অংশ খাও, একটি অংশ প্রতিবেশীদেরকে দাও এবং একটি অংশ মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করো

কয়েকটি নির্ধারিত দিন বলতে কোন দিনের কথা বুঝনো হয়েছে৷ এ ব্যাপারে মতবিরোধ আছেএকটি মত হচ্ছে, এর অর্থ, যিলহজ্জের প্রথম দশটি দিনইবনে আব্বাস (রা) হাসান বসরী, ইবরাহীম নখঈ, কাতাদাহ এবং অন্যান্য বহু সাহাবী ও তাবেঈনের এ মত উদ্ধৃত হয়েছে ইমাম আবু হানীফাও (র) এ মতের পক্ষেইমাম শাফেঈ (র) ও ইমাম আহমদেরও (র) একটি উক্তি এর সমর্থনে পাওয়া যায়দ্বিতীয় মতটি হচ্ছে, এর অর্থ, ইয়াওমুন্ নাহর (অর্থাৎ ১০ যিলহজ্জ) এবং তার পরের তিন দিনএর সমর্থনে ইবনে আব্বাস (রা), ইবনে উমর(রা), ইবরাহীম নখঈ, হাসান ও আতার উক্তি পেশ করা হয়ইমাম শাফেঈ (র) ও ইমাম আহমদেরও (র) একটি উক্তি এর সমর্থনে পাওয়া যায়তৃতীয় মতটি হচ্ছে, এর অর্থ তিন দিন তথা ইয়াওমুন্ নাহর (কুরবানীর ঈদের দিন) এবং এর পরের দু'দিনএর সমর্থনে হযরত উমর (রা), আলী (রা), ইবনে উমর (রা) ইবনে আব্বাস (রা), আনাস ইবনে মালিক (রা), আবু হুরাইরাহ (রা) সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব (রা) ও সাঈদ ইবনে জুবায়েরের (রা) উক্তি উদ্ধৃত হয়েছেফকীহগণের মধ্য থেকে সুফিয়ান সওরী (র), ইমাম মালেক (র), ইমাম আবু ইউসুফ (র) ও ঈমাম মুহাম্মাদ (র) এ মত গ্রহণ করেছেনহানাফী ও মালেকী মাযহাবে এ মতের ভিত্তিতেই ফতোয়া দেয়া হয়েছে এছাড়া কিছু একক উক্তি আছেযেমন কেউ কুরবানীর দিনগুলোকে পহেলা মহররমের দিন পর্যন্ত দীর্ঘ করেছেনকেউ শুধুমাত্র ইয়াওমুন্ নাহরের মধ্যেই তাকে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন কেউ ইয়াওমুন নাহরের পরে মাত্র আর একদিন কুরবানীর দিন হিসেবে স্বীকার করেছেনকিন্তু এগুলো দুর্বল উক্তিএসবের পেছনে শক্তিশালী যুক্তি প্রমাণ নেই )

কুরবানীর পশুর গোশত রক্ত আল্লাহর কাছে পৌছে না, পৌছে তোমাদের তাকওয়া :

(হাজ্ব:৩৭) তাদের গোশতও আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, তাদের রক্তও না৷ কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছে যায় তোমাদের তাকওয়া৷ তিনি তাদেরকে (অর্থাৎ গৃহপালিত পশুগুলিকে) তোমাদের জন্য এমনভাবে অনুগত করে দিয়েছেন যাতে তাঁর দেয়া পথনির্দেশনার ভিত্তিতে তোমরা তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো৷ আর হে নবী! সৎকর্মশীলদেরকে সুসংবাদ দিয়ে দাও৷

কুরবানীর পশুর গোশত নিজেরাও খাও এবং সচ্ছল বা অসচ্ছল অপরকেও দাও :

(হাজ্ব:৩৬) ....তখন তা থেকে নিজেরাও খাও এবং তাদেরকেও খাওয়াও যারা পরিতুষ্ট হয়ে বসে আছে এবং তাদেরকেও যারা নিজেদের অভাব পেশ করে৷


হযরত ইবরাহীম : স্বপ্ন দেখলেন তার পুত্র কুরবানী করছেন  :

(৩৭- আস সফ্ফাত :১০২) সে পুত্র যখন তার সাথে (ইবরাহীম আ: এর সাথে) কাজকর্ম করার বয়সে পৌঁছুলো তখন (একদিন ইবরাহীম তাকে বললো, “ হে পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখি তোমাকে আমি যাবেহ করছি, ৫৮ এখন তুমি বল তুমি কি মনে কর?” ৫৯ সে বললো, “ হে আব্বাজান! আপনাকে যা হুকুম দেয়া হচ্ছে ৬০ তা করে ফেলুন, আপনি আমাকে ইনশাআল্লাহ সবরকারীই পাবেন৷ ১০৩) শেষ পর্যন্ত যখন এরা দুজন আনুগত্যের শির নত করে দিল এবং ইবরাহীম পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিল৷ ৬১ ১০৪) এবং আমি আওয়াজ দিলাম, ৬২ “ হে ইবরাহীম! ১০৫) তুমি স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়ে দিয়েছো৷ ৬৩ আমি সৎকর্মকারীদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি৷ ৬৪ ১০৬) নিশ্চিতভাবেই এটি ছিল একটি প্রকাশ্য পরীক্ষা৷৬৫ ১০৭) একটি বড় কুরবানীর বিনিময়ে আমি এ শিশুটিকে ছাড়িয়ে নিলাম ৬৬ ১০৮) এবং পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে চিরকালের জন্য তার প্রশংসা রেখে দিলাম৷ ১০৯) শান্তি বর্ষিত হোক ইবরাহীমের প্রতি৷ ১১০) আমি সৎকর্মকারীদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি৷ ১১১) নিশ্চিতভাবেই সে ছিল আমার মুসলিম বান্দাদের অন্তরভুক্ত৷ ১১২) আর আমি তাকে ইসহাকের সুসংবাদ দিলাম, সে ছিল সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে একজন নবী৷ ১১৩) বরকত দিলাম তাকে ও ইসহাককে, ৬৭ এখন এ দুজনের বংশধরদের মধ্য থেকে কতক সৎকর্মকারী আবার কতক নিজেদের প্রতি সুস্পষ্ট জুলুমকারী৷ ৬৮

৫৮. একথা মনে রাখতে হবে , হযরত ইবরাহীম (আ ) স্বপ্ন দেখেননি যে , তিনি পুত্রকে যবেহ করে ফেলেছেনবরং তিনি দেখেছিলেন , তিনি তাকে যবেহ করছেনযদিও তিনি তখন স্বপ্নের এ অর্থই নিয়েছিলেন যে , তিনি পুত্রকে যবেহ করবেনএ কারণে তিনি ঠাণ্ডা মাথায় পুত্রকে কুরবানী করে দেবার জন্য একেবারেই তৈরি হয়ে গিয়েছিলেনকিন্তু স্বপ্ন দেখাবার মধ্যে মহান আল্লাহ যে সূক্ষ্ম বিষয় সামনে রেখেছিলেন তা সামনের ১০৫ আয়াতে তিনি নিজেই সুম্পষ্ট করে দিয়েছিল
৫৯. পুত্রকে একথা জিজ্ঞেস করার এ অর্থ ছিল না যে, তুমি রাজি হয়ে গেলে আল্লাহর হুকুম তামিল করবো অন্যথায় করবো নাবরং হযরত ইবরাহীম আসলে দেখতে চাচ্ছিলেন , তিনি যে সৎ সন্তানের জন্য দোয়া করেছিলেন সে যথার্থই কতটুকু সৎ যদি সে নিজে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষে প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকে , তাহলে এর অর্থ হয় দোয়া পুরোপুরি কবুল হয়েছে এবং পুত্র নিছক শারীরিক দিক দিয়েই তাঁর সন্তান নয় বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক দিয়েও তাঁর সুসন্তান
৬০. এ শব্দগুলো পরিস্কার জানিয়ে দিচ্ছে , নবী - পিতার স্বপ্নকে পুত্র নিছক স্বপ্ন নয় বরং আল্লাহর হুকুম মনে করেছিলেন এখন যদি যথাযর্থই এটি আল্লাহর হুকুম না হতো তাহলে অবশ্যই আল্লাহ পরিস্কারভাবে বা ইংগিতে মাধ্যমে বলে দিতেন যে , ইবরাহীম পুত্র ভুলে একে হুকুম মনে করে নিয়েছেকিন্তু পূর্বাপর আলোচনায় এর কোন ইংগিত নেইএ কারণে নবীদের স্বপ্ন নিছক স্বপ্ন নয় বরং তাও হয় এক ধরনের অহী , মুসলমানরা এ বিশ্বাস পোষণ করেএকথা সুস্পষ্ট , যে কথার মাধ্যমে এতবড় একটি নিয়ম আল্লাহর শরীয়াতের অন্তরভুক্ত হতে পারে তা যদি সত্য ভিত্তিক না হতো বরং নিছক একটি বিভ্রান্তি হতো তাহলে আল্লাহ তার প্রতিবাদ করতেন না , এটা হতো একটি অসম্ভব ব্যাপারকুরআনকে যারা আল্লাহর কালাম বলে মানে তাদের পক্ষে আল্লাহর এ ধরনের ভুল হয়ে যেতে পারে একথা মেনে নেয়া একেবারেই অসম্ভব
৬১. অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আ) যবেহ করার জন্য পুত্রকে চিৎ করে শোয়ননি বরং উপুড় করে শুইয়ে দিয়েছেন , যাতে যবেহ করার সময় পুত্রের মুখ দেখে কোন প্রকার স্নেহ মমতার বসে তাঁর হাত কেঁপে না যায়তাই তিনি নিচের দিক থেকে হাত রেখে ছুরি চালাতে চাচ্ছিলেন

৬২. ব্যাকরণবিদদের একটি দল বলেন , এখানে " এবং " শব্দটি " তখন" অর্থে ব্যবহৃত হয়েছেঅর্থাৎ বাক্যটি হবে --- " যখন এরা দু'জনে আনুগত্যের শির নত করে দিল এবং ইবরাহীম পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিল তখন আমি আওয়াজ দিলাম।" কিন্তু অন্য একটি দল বলেন , এখানে " যখন " শব্দটির জওয়াব উহ্য রয়ে গেছে এবং তাকে শ্রোতার মনের কল্পনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছেকারণ কথা এত বড় ছিল যে , তাকে শব্দের মাধ্যমে বর্ণনা করার পরিবর্তে কল্পনারই জন্য ছেড়ে দেয়া বেশী সংগত ছিলআল্লাহ যখন দেখে থাকবেন বুড়ো বাপ তার বুড়ো বয়সের আকাংখায় চেয়ে পাওয়া পুত্রকে নিছক তাঁর সন্তুষ্টিলাভের জন্য কুরবানী করে দিতে প্রস্তুত হয়ে গেছেন এবং পুত্রও নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেছে , তখন এ দৃশ্য দেখে রহমতের দরিয়া কেমন নাজানি উথলে উঠে থাকবে এবং দুই বাঁধনহারা হয়ে গিয়ে থাকবে , তা কেবল কল্পনাই করা যেতে পারেকথায় তার অবস্থা যতই বর্ণনা করা হোক না কেন তা ব্যক্ত করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়বরং বর্ণনায় তার আসল দৃশ্যের অতি অল্পই ফুটে উঠবে

৬৩. অর্থাৎ তুমি পুত্রকে যবেহ করে দিয়েছো এবং তার প্রাণবায়ু বের হয়ে গেছে , এটা তো আমি তোমাকে দেখাইনিবরং আমি দেখিয়েছিলাম , তুমি যবেহ করছোতুমি সে স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়ে দিলেকাজেই এখন তোমার সন্তানের প্রাণবায়ূ বের করে নেয়া আমার লক্ষ নয়আসল উদ্দেশ্য যা কিছু তা তোমার সংকল্প , উদ্যোগ ও প্রস্তুতিতেই সফল হয়ে গেছে

৬৪. অর্থাৎ যারা সংকর্মের পথ অবলম্বন করে তাদেরকে আমি খামখা কষ্টের মধ্যে ফেলে দেবার এবং দুঃখ ও ক্লেশের মুখোমুখি করার জন্য পরীক্ষার সম্মুখীন করি নাবরং তাদের উন্নত গুণাবলী বিকশিত করার এবং তাদেরক উচ্চ মর্যাদা দান করার জন্যই তাদেরকে পরীক্ষার মুখোমুখি করিতারপর পরীক্ষার খাতিরে তাদেরকে যে সংকট সাগরে নিক্ষেপ করি তা থেকে নিরাপদে উদ্ধারও করি তাই দেখো , পুত্রের কুরবানীর জন্য তোমার উদ্যোগ প্রবণতা ও প্রস্তুতিই এমন মর্যাদা দানের জন্য যথেষ্ট হয়ে গেছে , যা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য যথার্থই পুত্র উৎসর্গকারী লাভ করতে পারতোএভাবে আমি তোমার পুত্রের প্রাণ ও রক্ষা করলাম এবং তোমাকের এ উচ্চ মর্যাদাও দান করলাম

৬৫. অর্থাৎ তোমার হাতে তোমার পুত্রকে যবেহ করা উদ্দেশ্য ছিল নাবরং দুনিয়ার কোন জিনিসকে তুমি আমার মোকাবিলায় বেশী প্রিয় মনে করো কিনা , সে পরীক্ষা নেয়াই ছিল আসল উদ্দেশ্য

৬৬. " বড় কুরবানী " বলতে বাইবেল ও ইসলামী বর্ণনা অনুসারে একটি ভেড়া সে সময় আল্লাহর ফেরেশতা হযরত ইবরাহীমের সামনে এটি পেশ করেন পুত্রের পরিবর্তে একে যবেহ করার জন্য একে "বড় কুরবানী " বলার কারণ হচ্ছে এই যে , এটি ইবরাহীমের ন্যায় আল্লাহর বিশ্বস্ত বান্দার জন্য ইবরাহীম পুত্রের ন্যায় ধৈর্যশীল ও প্রাণ উৎসর্গকারী পুত্রের প্রাণের বিনিময়ে ছিল এবং আল্লাহ একে একটি নজীর বিহীন কুরবানীর নিয়ত পুরা করার অসিলায় পরিণত করেছিলেনএ ছাড়াও একে " বড় কুরবানী " গণ্য করার আর একটি বড় কারণ দিয়েছেন যে , এ তারিখে সারা দুনিয়ায় সমস্ত মু'মিন পশু কুরবানী করবে এবং বিশ্বস্ততা ও প্রাণ উসৎর্গকারী এ মহান ঘটনার স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত করতে থাকবে



হযরত ইবরাহীম : কুরবানী করেছিলেন তার কোন পুত্রকে হযরত ইসামঈল : কে নাকি হযরত ইসহাক : কে :


(৩৭- আস সফ্ফাত :১১৩) বরকত দিলাম তাকে ও ইসহাককে, ৬৭ এখন এ দুজনের বংশধরদের মধ্য থেকে কতক সৎকর্মকারী আবার কতক নিজেদের প্রতি সুস্পষ্ট জুলুমকারী৷ ৬৮

৬৭. এখানে এসে আমাদের সামনে এ প্রশ্ন দেখা দেয় যে , হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর যে পুত্রকে কুরবানী করতে উদ্যত হয়েছিলেন এবং যিনি স্বতর্ষ্ফূভাবে নিজেকে এ কুরবানীর জন্য পেশ করে দিয়েছিলেন তিনি কে ছিলেন ৷ সর্বপ্রথম এ প্রশ্নের জবাব আমাদের সামনে আসছে বাইবেল থেকেঃ
" ঈশ্বর ইব্রাহীমের পরীক্ষা করিলেনতিনি তাঁহাকে কহিলেন , হে ইব্রাহিম .................... তুমি আপন পুত্রকে , তোমার অদ্বিতীয় পুত্রকে , যাহাকে তুমি ভালবাস , সেই ইসহাককে লইয়া মোরিয়া দেশে যাও এবং তথাকার যে এক পর্বতের কথা আমি তোমাকে বলিব , তাহার উপর তাহাকে হোমার্থে বলিদান কর। " (আদিপুস্তক ২২: ১- ২ )
এ বর্ণনায় একদিকে বলা হচ্ছে , আল্লাহ হযরত ইসহাকের কুরবানী চেয়েছিলেন আবার অন্যদিকে একথা বলা হচ্ছে , তিনি একমাত্র পুত্র ছিলেন অথচ বাইবেলের নিজেরই অন্যান্য বর্ণনা থেকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ হয় যে , হযরত ইসহাক একমাত্র পুত্র ছিলেন নাতাই বাইবেলের নিম্নোক্ত বিস্তারিত বক্তব্যটি একবার দেখুনঃ
" আব্রামের স্ত্রী সারী নিঃসন্তান ছিলেন, এবং হাগার নামে তার এক মিস্রীয় দাসী ছিলতাহতে সারী আব্রামকে কহিলেন দেখ সদাপ্রভূ আমাকে সন্ধ্যা করিয়াছেন , বিনয় করি , তুমি আমার দাসীর কাছে গমন কর , কি জানি ইহা দ্বারা আমি পুত্রবতী হইতে পারিবতখন আব্রাম সারীর বাক্যে সম্মত হইলেন এইরূপে কানান দেশে আব্রাম দশ বৎসর বাস করিলে পর আব্রামের স্ত্রী সারী আপন দাসী মিস্রীয় হাগারকে লইয়া আপন স্বামী আব্রামের সহিত বিবাহ দিলেনপরে আব্রাম হাগারের কাছে গমন করিলে সে গর্ভবতী হইল। " (আদি পুস্তক ১৬: ১-৪ )
"সদাপ্রভূর দতূ তাহাকে আরও কহিলেন , দেখ , তোমার গর্ভ হইয়াছে , তুমি পুত্র প্রসব করিবে , ও তাহার নাম ইশ্মায়েল [ ঈশ্বর শুনেন ] রাখিবে।" (আদিপুস্তক ১৬: ১১ )
" আব্রামের ছেয়াশী বৎসর বয়সে হাগার আব্রামের নিমিত্তে ইশ্মায়েলকে প্রসব করিল ।"(১৬:১৬ )
" আর ঈশ্বর আব্রাহামকে কহিলেন ,তুমি তোমার স্ত্রী সারীকে আর সারী বলিয়া ডাকিওনা, তাহার নাম সারা [রানী ] হইল .............. তাহা হইতে এক পুত্রও তোমাকে দিব ; .............. তুমি তাহার নাম ইস্‌হাক [হাস্য ] রাখিবে ,............ আগামী বৎসরের এই ঋতুতে সারা তোমার নিমিত্তে যাহাকে প্রসব করিবে , ........... পরে আব্রাহাম আপনপুত্র ইশ্মায়েলকে ও ............... গৃহে যত পুরুষ ছিল , সেই সকলকে লইয়া ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারে সেই তাহাদের লিঙ্গাগ্রচর্ম ছেদন করিলেনআব্রাহামের লিঙ্গাগ্রের ত্বক ছেদন কালে তাঁহার বয়স নিরানব্বই বৎসর আর তাঁহার পুত্র ইশ্মায়েলের লিঙ্গাগ্রের ত্বক ছেদন কালে তাহার বয়স তের বৎসর । " (আদি পুস্তক ১৭:১৫ - ২৫ )
" আব্রাহামের একশত বৎসর বয়সে তাঁহার পুত্র ইসহাকের জন্ম হয়।" (আদি পুস্তক ২১:৫)
এ থেকে বাইবেলের বর্ণনার বৈপরীত্য পরিষ্কার সামনে এসে যায়একথা সুস্পষ্ট , ১৪ বছর পর্যন্ত হযরত ইসমাঈল (আ ) হযরত ইবরাহীমের (আ ) একমাত্র সন্তান ছিলেনএখন যদি একমাত্র পুত্রের কুরবানী চাওয়া হয়ে থাকে তাহলে তা হযরত ইসহাকের নয় বরং ইসমাঈলের কুরবানী ছিল কারণ তিনিই ছিলেন একমাত্র সন্তান আর যদি হযরত ইসহাকের কুরবানী চাওয়া হয়ে থাকে তাহলে আবার একথা বলা ঠিক নয় যে , একমাত্র সন্তানের কুরবানী চাওয়া হয়েছিল
এরপর আমরা ইসলামী বর্ণনাগুলোর প্রসংগে আসতে পারিসেখানে দেখি ভীষণ মতবিরোধ মুফাসসিরগণ সাহাবা ও তাবেঈগণের যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছন তাতে একটি দলের উক্তি এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে , তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহীমের পুত্র হযরত ইসহাকএ দলে রয়েছেন মনীষীগণঃ
হযরত উমর (রা) , হযরত আলী (রা) , হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) , হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা) , হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) , হযরত আবু হুরাইরাহ (রা) , কতাদাহ , ইকরামাহ , হাসান বাসরী , সাঈদ ইবনে জুবাইর , মুজাহিদ , শা'বী , মাসরূক মাকহূল , যুহরী , আতা , মুকাতিল , সুদ্দী , কা'ব আহবার , যায়েদ ইবনে আসলাম এবং আরো অনেকে
দ্বিতীয় দলটি বলেন , তিনি ছিলেন হযরত ইসমাঈলএ দলে রয়েছেন নিম্নোক্ত মনীষীগণঃ
হযরত আবু বকর (রা) , হযরত আলী (রা) , হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) ,হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) , হযরত আবু হুরাইরাহ (রা) , হযরত মু'আবীয়াহ (রা) ইকরামাহ , মুজাহিদ , ইউসুফ ইবনে মেহরান , হাসান বাসরী , মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল কুরযী , শা'বী , সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব , দ্বাহহাক , মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন (মুহাম্মাদ আল বাকের ) ' রাবী ' ইবনে আনাস , আহমাদ ইবনে হামবল এবং আরো অনেকে
এ দু'টি তালিকা পর্যলোচনা করলে দেখা যাবে এর মধ্যে অনেকগুলো নাম উভয় তালিকায় পাওয়া যাচ্ছেঅর্থাৎ একজন মনীষী বিভিন্ন সময় দু'টি ভিন্ন উক্তি করেছেন যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে ইকরামাহ এ উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে , তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহীমের পুত্র হযরত ইসহাককিন্তু তাঁরই থেকে আতা ইবনে আবী রাবাহ একথা উদ্ধৃত করেছেনঃ (আরবী ------------------------------------------------------------) (ইহুদীদের দাবী হচ্ছে , তিনি ছিলেন হযরত ইসহাক কিন্তু ইহুদীরা মিথ্যা বলেছে ) অনুরূপভাবে হযরত হাসান বাসরী থেকে একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে , তিনি হযরত ইসহাকের কুরবানীর প্রবক্তা ছিলেন কিন্তু আমর ইবনে উবাইদ বলেন , হাসান বাসরীর এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না যে , হযরত ইবরাহীমের (আ) যে পুত্রকে যবেহ করার হুকুম হয়েছিল তিনি ছিলেন হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম
এ বর্ণনার বিভিন্নার ফলে মুসলিম আলেমণের একটি দল পূর্ণ নিশ্চয়তা সহকারে হযরত ইসহাকের পক্ষে রায় দিয়েছেনযেমন ইবনে জারীর ও কাযী ঈয়াযঅনেকে চূড়ান্তভাবে এ মত প্রকাশ করেছেন যে , হযরত ইসমাঈলকেই যবেহ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিলযেমন ইবনে কাসীর আবার কেউ কেউ সংশয়াপন্ন যেমন জালালুদ্দীন সুয়ূতীকিন্তু গবেষণা ও অনুসন্ধানের দৃষ্টিতে বিচার করলে একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে হযরত ইসমাঈলকেই যবেহ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিলএর সপক্ষে নিম্নোক্ত যুক্তি রয়েছেঃ
একঃ ওপরে কুরআন মজীদের এ বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে যে , স্বদেশ থেকে হিজরাত করার সময় হযরত ইবরাহীম (আ) একটি সৎকমশীল পুত্রের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেনএর জবাবে আল্লাহ তাঁর একটি ধৈর্যশীল সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেনবক্তব্যের অন্তরনিহিত অর্থ পরিস্কার একথা জানিয়ে দিচ্ছে যে , এ দোয়া ঠিক তখন করা হয়েছিল যখন তিনি ছিলেন সন্তানহীনআর যে সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল সেটি ছিল তাঁর প্রথম সন্তানতারপর কুরআনের বক্তব্যের ধারাবহিক বর্ণনা থেকে একথাও প্রকাশ হয় যে , সে শিশুটিই যখন পিতার সাথে দৌড় ঝাঁপ করার যোগ্য হয়ে গেলো তখন তাকে যবেহ করার ইশারা করা হলোএখন একথা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত যে , হযরত ইবরাহীমের (আ) প্রথম সন্তান ছিলেন হযরত ইসমাঈল হযরত ইসহাক প্রথম সন্তান ছিলেন না কুরআনে হযরত ইবরাহীমের সন্তানের ধারাবাহিকতার বর্ণনা এভাবে দেয়া হয়েছেঃ
আরবী ------------------------------------------------------------------------------
দুইঃ কুরআন মজীদে যেখানে হযরত ইসহাকের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে সেখানে তাঁর জন্য " গোলামুন আলীমন " (জ্ঞানবান বালক ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছেঃ
আরবী --------------------------------------------------------------------------------
কিন্তু এখানে যে সন্তানটির সুসংবাদ দেয়া হয়েছে তার জন্য " গোলামুন হালীমুন " (ধৈর্যশীল বালক ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছেএ থেকে প্রমাণিত হয় , দুই পুত্রের দু'টি পৃথক বৈশিষ্ট ছিল এবং যবেহ করার হুকুমটি জ্ঞানবান সন্তানের জন্য ছিল না , ছিল ধৈর্যশীল সন্তানের জন্য
তিনঃ কুরআন মজীদে হযরত ইসহাকের সুসংবাদ দেবার সাথে সাথেই এ সুসংবাদও দেয়া হয়েছিল যে , তাঁর গৃহে ইয়াকুবের মতো পুত্র সন্তান জন্ম নেবেঃ
আরবী --------------------------------------------------------------------------------
এখন একথা পরিস্কার যে , সন্তান জন্মের খবর দেবার সাথে সাথেই তার ওখানে একটি সুযোগ্য পুত্রসন্তানের জন্মের ও খবর দেয়া হয়ে গিয়ে থাকে , তার ব্যাপারে যদি হযরত ইবরাহীমকে এ স্বপ্ন দেখানো হয় যে , তিনি তাকে যবেহ করছেন , তাহলে হযরত ইবরাহীম কখনো একথা বুঝতে পারতেন না যে , তাঁর এ পুত্রকে কুরবানী করে দেবার ইংগিত করা হচ্ছে আল্লামা ইবনে জারীর এ যুক্তিটির জবাবে বলেন , সম্ভবত এ স্বপ্নটি হযরত ইবরাহীমকে এমন এক সময় দেখানো হয় যখন হযরত ইসহাকের গৃহে হযরত ইয়াকুবের জন্ম হয়ে গেছে
কিন্তু আসলে এটি ঐ যুক্তির একটি অত্যন্ত দুর্বল জবাবকুরআন মজীদের শব্দ হচ্ছেঃ " যখন ছেলেটি বাপের সাথে দৌড় ঝাঁপ করার যোগ্য হয়ে গেলো" ঠিক এ সময়ই এ স্বপ্নটি দেখানো হয়েছিলযে ব্যক্তি মুক্ত মনে এ শব্দগুলো পড়বে তার সমানে ভেসে উঠবে আট দশ বছরের একটি ছেলের ছবিকোন জোয়ান ব্যক্তি যিনি সন্তানের পিতা তাঁর সম্পর্কে একথা বলা হয়েছে বলে কেউ কল্পনা ও করতে পারবে না
চারঃ কুরআনে আল্লাহ সমস্ত কাহিনী বর্ণণা করার পর শেষে বলছেন , " আমি তাকে ইসহাকের সুসংবাদ দিয়েছি , সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে একজন নবী। " এ থেকে পরিস্কার জানা যায় , যে পুত্রকে যবেহ করার ইংগিত দেয়া হয়েছিল , এটি সে পুত্র নয়বরং পূর্বে অন্য কোন পুত্রের সুসংবাদ দেয়া হয়তারপর যখন সে পিতার সাথে দৌড়াদৌড়ি ও চলাফেরা করার যোগ্যতা অর্জন করে তখনই তাকে যবেহ করার হুকুম হয়তারপর যখন হযরত ইবরাহীম এ পরীক্ষায় সফলকাম হয়ে যান তখন তাঁকে আর এক সন্তান অর্থাৎ ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্মের সুসংবাদ দেয়া হয়ঘটনার এ বিন্যাস চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দান করে যে , যে পুত্রটিকে যবেহ করার হুকুম হয়েছিল তিনি হযরত ইসহাক ছিলেন নাবরং তাঁর কয়েক বছর আগে সে পুত্রের জন্ম হয়েছিলআল্লামা ইবনে জারীর এ সুস্পষ্ট যুক্তিটি এ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন যে , প্রথমে কেবলমাত্র হযরত ইসহাকের জন্মের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল , তারপর যখন তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কুরবানী করতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন তখন তাঁর নবী হওয়ার সুসংবাদ দেয়া হলো কিন্তু এটি তার প্রথম জবাবটি থেকেও দুর্বলতারসত্যই যদি ব্যাপার এটাই হতো , তাহলে আল্লাহ এভাবে বলতেন নাঃ " আমি তাকে ইসহাকের সুসংবাদ দেই , সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে একজন নবী। " বরং তিনি বলতেন , আমি তাকে এ এ সুসংবাদ দেই যে , তোমার এ পুত্র একজন নবী হবেন সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে
পাঁচঃ নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে প্রমাণিত যে , হযরত ইসমাঈলের বিনিময়ে যে ভেড়াটি যবেহ করা হয়েছিল তার শিং কা'বা ঘরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরের (রা ) যামানা পর্যন্ত সংরক্ষিত ছিলপরবর্তীতে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ যখন হরম শরীফে ইবনে যুবাইরকে (রা) অবরোধ করে এবং কা'বা ঘর ভেঙে ফেলে তখন এ শিংও নষ্ট হয়ে যায়ইবনে আববাস ও আমের শা'বী উভয়ই এ মর্মে সাক্ষ দেন যে , তারা নিজেরা কা'বাঘরে এ শিং দেখেছিলেন (ইবনে কাসীর ) এ দ্বারা প্রামাণিত হয় যে , কুরবানীর এ ঘটনা সিরিয়ায় নয় , মক্কা মু'আযযমায় সংঘটিত হয়েছিলএবং হযরত ইসমাঈলের সাথেই ঘটেছিলতাইতো হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈলের নির্মিত কা'বাঘরে তার স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল
ছয়ঃ শত শত বছর থেকে আরবীয় বর্ণনাসমূহে ও কিংবদন্তীতে একথা সংরক্ষিত ছিল যে , কুরবানীর এ ঘটনা ঘটেছিল মিনায়আর এটা শুধুমাত্র কিংবদন্তীই ছিল না বরং সে সময় থেকে নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যামানা পর্যন্ত হজ্জের কর্মকাণ্ডের মধ্যে এ কাজটিও নিয়মিতভাবে শামিল হয়ে আসছিল যে এ মিনা নামক স্থানে যেখানে হযরত ইবরাহীম কুরবানী করেছিলেন প্রত্যেক ব্যক্তি সেখানে গিয়ে পশু কুরবানী করতোতারপর যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগম হলো তখন তিনিও এ পদ্ধতি অব্যাহত রাখেনএমন কি আজো হজ্জের সময় যিলহজ্জের দশ তারিখে মিনায় কুরবানী করা হয়সাড়ে চার হাজার বছরের এ অবিচ্ছিন্ন কার্যক্রম একথার অনস্বীকার্য প্রমাণ পেশ করে যে , হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের এ কুরবানীর উত্তরাধিকারী ছিল বনী ইসমাঈল , বনী ইসহাক নয় হযরত ইসহাকের বংশে এ ধরনের কোন রেওয়াজ কোন দিন জারি থাকেনি , যাতে সমস্ত জাতির একসাথে কুরবানী করতো এবং তাকে হযরত ইবরাহীমের কুরবানীর স্মৃতি বলা হতো
" প্রকৃত ব্যাপার তো আল্লাহই জানেনতবে বাহ্যত মনে হয় , এ সমস্ত উক্ত (হযরত ইসহাকের আল্লাহর জন্য কুরবানী হবার পক্ষে যেগুলো বলা হয়েছে ) কা'ব আহবার থেকে উদ্ধৃত হয়েছেতিনি যখন হযরত উমরের (রা) আমলে মুসলমান হন তখন মাঝে মধ্যে ইহুদী ও খৃষ্টানদের প্রাচীর কিতাবসমূহের বাণী তাঁদেরকে পড়ে শুনাতেন এবং হযরত উমর (রা) সেসব শুনতেনএ কারণে অন্য লোকেরাও তাঁর কথা শুনতে শুরু করে এবং তিনি যেসব ভালো মন্দ বর্ণনা করতেন সেগুলো তারা বর্ণনা করতে শুরু করেঅথচ এ উম্মতের জন্য তাঁর এ তথ্য সম্ভারের মধ্য থেকে কোন জিনিসেরই প্রয়োজন ছিল না। "
মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কুরাযীর একটি রেওয়ায়াত এ প্রশ্নটির ওপর আরো কিছুটা আলোকপাত করেতিনি বর্ণনা করেন , একবার আমার উপস্থিতিতে হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীযের (র ) সামনে এ প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে , আল্লাহর জন্যে যবেহ করা হয়েছিল কাকে , হযরত ইসহাককে না হযরত ইসমাঈলকে ৷ সে সময় এমন এক ব্যক্তিও মজলিসে হাজির ছিলেন যিনি পূর্বে ইহুদী আলেমদের অন্তরভুক্ত ছিলেন এবং পরে সাচ্চা দিলে মুসলমান হয়েছিলেন তিনি বলেন , " হে আমীরুল মু'মেনীন ! আল্লাহর কসম , তিনি ইসমাঈল ছিলেনইহুদীরা একথা জানে কিন্তু আরবদের প্রতি হিংসাবশত তারা দাবী করে যে , হযরত ইসহাককে আল্লাহর জন্য যবেহ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। (ইবনে জারীর ) এ দু'টি কথাকে মিলিয়ে দেখলে জানা যায় , আসলে এটা ছিল ইহুদী প্রচারণার প্রভাব এবং মুসলমানদের মধ্যে এ প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল আর মুসলমানরা যেহেতু তাত্বিক বিষয়ে সবসময় বিদ্বেষ ও স্বার্থপ্রীতি মুক্ত থেকেছে তাই তাদের অনেকেই প্রাচীর সহীফাগুলোর বরাত দিয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনার ছদ্মবরণে ইহুদীরা যেসব বর্ণনা পেশ করতো সেগুলোকে নিছক একটি তাত্বিক সত্য মনে করে গ্রহণ করে নেয় এবং একথা চিন্তা করেনি যে , এর মধ্যে তত্বের পরিবর্তে বিদ্বেষ ও স্বার্থপ্রীতি সক্রিয় রয়েছে
৬৮. যে উদ্দেশ্য হযরত ইবরাহীমের কুরবনীর কাহিনী এখানে বর্ণনা করা হয়েছে এ বাক্যটি তার সমগ্র আবয়বের ওপর আলোকপাত করেহযরত ইবরাহীমের দুই পুত্রের বংশ থেকে দুটি সুবিশাল জাতির সৃষ্টির হয় একটি বনী ইসরাঈল জাতিতাদের মধ্যে জন্ম হয় দুনিয়ার দু'টি বড় ধর্মমত (ইহুদীবাদ ও খৃষ্টবাদ ) তারা পৃথিবীর অনেক বড় ও বিস্তৃত অংশকে নিজেদের অনুসারী করেদ্বিতীয়টি বনী ইসমাঈল জাতি কুরআন নাযিলের সময় তারা ছিল সমগ্র আরববাসীর নেতা ও অনুসরণযোগ্য সে সময় মক্কা মু'আযযমার কুরাইশ গোত্র তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদার অধিকারী ছিলইবরাহীমী বংশধারার এ দু'টি শাখা যে উন্নতি , বিস্তৃতি ও খ্যাতি অর্জন করে তা সম্ভব হয় হযরত ইবরাহীম ও তাঁর দুই মহান মর্যাদা সম্পন্ন পুত্রের সাথে তাদের রক্ত সম্পর্কের কারণেনয়তো দেখা যায় , দুনিয়ায় এমন কত শত পরিবারের উদ্ভব হয়েছে এবং কালক্রমে অপরিচিতর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এখন মহান আল্লাহ এ পরিবারের ইতিহাসের সবচেয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল কর্মকাণ্ড বর্ণনা করার পর এ উভয় দলকে এ অনুভূতি দান করেছেন যে , তোমরা দুনিয়ায় যা কিছু মর্যাদা লাভ করছো , এসবের মূলে রয়েছে তোমাদের বাপ দাদা ইবরাহীম , ইসমাঈল ও ইসহাক আলাইহিমুস সালাম প্রতিষ্ঠিত আল্লাহর আনুগত্য , নিঃস্বার্থ আন্তরিকতা ও আল্লাহর হুকুমের জন্য উৎসর্গিত প্রাণের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য তিনি তাদেরকে বলেন , আমি তাদেরকে যে বরকত ও সমৃদ্ধি দান করেছিলাম এবং নিজের দয়া ও অনুগ্রহের যে বারিধারা তাদের প্রতি বর্ষণ করেছিলাম তা চোখ বন্ধ করে বর্ষণ করিনি আমি সহসাই কোন কারণ ছাড়াই এক ব্যক্তি ও তাঁর দুই পুত্রকে বাছাই করে তাদের প্রতি অনুগ্রহ ও দাক্ষিণ্যের ঝরণাধারা প্রবাহিত করিনিবরং তাঁরা নিজেদের প্রকৃত মালিক ও প্রভুর প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার কিছু প্রমান পেশ করেছিলেন এবং তারই ভিত্তিতে এসব অনুগ্রহের হকদার হয়েছিলেনএখন তোমরা নিছক তাদের আওলাদ ও অহংকারের ভিত্তিতে সেসব অনুগ্রহ ও নিয়ামতের হকদার হতে পারো নাআমি তো অবশ্যই দেখবো , তোমাদের মধ্যে কে সৎকর্মশীল এবং কে জালেম ও পাপাচারীতারপর যে যেমনটি হবে তার সাথে ঠিক তেমনি ধরনেরই ব্যবহার করা হবে

===========================================
প্রশ্ন ২০ :  বে নামাজীর পশু জবেহ করা যাবে কি? 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন