কুরাইশ ও আরব দের সম্পর্কে বর্ণনা সমূহ :
১। তুমি সতর্ক করে দাও এমন এক জাতিকে যার বাপ-দাদাকে সতর্ক করা হয়নি
(৩৬-ইয়াসিন :৬) যাতে তুমি সতর্ক করে দাও এমন এক জাতিকে যার
বাপ-দাদাকে সতর্ক করা হয়নি এবং এ কারণে তারা গাফলতিতে ডুবে আছে৷ ৪
৪. এ আয়াতের
দুটি অনুবাদ হতে পারে। এর একটি অনুবাদ ওপরে করা হয়েছে। আর দ্বিতীয়টি এও হতে পারে যে, "একটি জাতির লোকদেরকে তুমি সে
জিনিসের ভয় দেখাও যার ভয় তাদের বাপ-দাদাদেরকেও দেখানো হয়েছিল, কারণ তারা গাফলতিতে ডুবে
আছে"। প্রথম অর্থটি গ্রহণ করলে বাপ-দাদা বলতে নিকট অতীতে অতিক্রান্ত বাপ-দাদাদের
কথা বুঝানো হবে। কারণ দূর অতীতে আরব ভুখণ্ডে বহু নবী -রসূল এসেছিলেন। আর দ্বিতীয় অর্থ গ্রহণ করলে এর
অর্থ দাড়াবে প্রাচীনকালে এ জাতির পূবর্পুরুষদের কাছে নবীদের মাধ্যমে যে পয়গাম এসেছিল
এখন তাকে পুনরুজ্জীবিত করো। কারণ এরা তা ভুলে গেছে। এদিক দিয়ে দুটি অনুবাদের মধ্যে আসলে কোন বৈপরীত্য
নেই এবং অর্থের দিক দিয়ে উভয় অনুবাদ সঠিক ও অর্থবহ।
এ জায়গায় সন্দেহ জাগে যে, এ জাতির পূববর্র্তী লোকেরা এমন একটি যুগ অতিক্রম করেছিল যখন তাদের কাছে কোন নবী আসেনি, এ সময়ে নিজেদের গোমরাহীর জন্য তারা নিজেরা কেমন করে দায়ী হতে পারে৷ এর জবাব হচ্ছে, আল্লাহ যখনই দুনিয়ায় কোন নবী পাঠান তখনই তাঁর শিক্ষা ও হিদায়াতের প্রভাব দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং বংশ পরম্পরায় এ
প্রভাব বিস্তার লাভ করতে থাকে। এ প্রভাব যতদিন টিকে থাকে এবং নবীর অনুসারীদের মধ্যে
যতদিন পযর্ন্ত এমনসব লোকের আবির্ভাব ঘটতে থাকে যারা হিদায়াতের প্রদীপ উজ্জ্বল করে
যেতে থাকেন ততদিন পযর্ন্তকার সময়কে হিদায়াতবিহীন গণ্য করা যেতে পারে না। আর যখন এ নবী শিক্ষার প্রভাব একদম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় অথবা তা পুরোপুরি বিকৃত হয়ে যায় তখন
সেখানে নতুন নবীর আবির্ভাব অপরিহার্য হয়ে ওঠে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পূবে আরবে হযরত ইবরাহীম, ইসমাঈল, শোআইব, মূসা, ও ঈসা আলাইহিমুস সালামের শিক্ষার প্রভাব চতুরদিকে
ছড়িয়েছিল। আর মাঝে মাঝে এ জাতির মধ্যে এমনসব লোকের আবির্ভাব ঘটতো অথবা বাইর থেকে
আগমন হতে থাকতো যারা এ প্রভাবগুলোকে তরতাজা করে তুলতেন। যখন এ প্রভাবগুলো নিশ্চিহ্ন
হয়ে যাবার কাছাকাছি পৌছে যায় এবং আসল শিক্ষাও বিকৃত হয়ে যায় তখন মহান আল্লাহ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠান এবং এমন ব্যবস্থা অবলম্বন করেন যার
ফলে তাঁর হিদায়াতের প্রভাব নিশ্চিহ্ন হতে পারবে না এবং তা বিকৃত হতেও পারবে না। (আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য
দেখুন সূরা সাবা, ৫ টীকা)।
২। তাদের অধিকাংশই শাস্তি লাভের ফায়সালার হকদার হয়ে গেছে, এ জন্যই তারা ঈমান আনে না৷
৫. যারা নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতের মোকাবিলায় জিদ ও গোয়ার্তুমির পথ অবলম্বন
করেছিল এবং তাঁর কথা কোনভাবেই মানবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এখানে তাদের কথা বলা
হয়েছে। তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, "তারা শাস্তিলাভের ফায়সালার
হকদার হয়ে গেছে, তাই তারা ঈমান আনছে না। এর অর্থ হচ্ছে, যারা উপদেশে কান দেয় না এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীদের মাধ্যমে প্রমাণ পুরোপুরি
উপস্থাপিত হবার পরও সত্য অস্বীকার ও সত্যের সাথে শত্রুতার নীতি অবলম্বন করে চলতেই থাকে
তাদের ওপর তাদের নিজেদেরই কৃতকর্মের দুর্ভোগ চাপিয়ে দেয়া হয় এবং তারপর তাদের
ঈমানলাভের সৌভাগ্য হয় না। এ বিষয়বস্তুকে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে এ বাক্যের মধ্যে প্রবেশ করে দেয়া হয়েছে যে, "তুমি তো এমন ব্যক্তিকেই সতর্ক করতে পারো যে উপদেশ মেনে চলে
এবং না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে"।
৩। আমি তাদের গলায় বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে, যাতে তাদের চিবুক পর্যন্ত জড়িয়ে গেছে, তাই তারা মাথা উঠিয়ে দাঁড়িয়ে আছে
(৩৬-ইয়াসিন :৮) আমি তাদের গলায় বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে, যাতে তাদের চিবুক পর্যন্ত
জড়িয়ে গেছে, তাই তারা মাথা উঠিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷৬
৬. এ আয়াতে
বেড়ি মানে হচ্ছে তাদের নিজেদের হঠকারিতা। তাদের জন্য সত্য গ্রহণ করার পথে এটি প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। "চিবুক পযর্ন্ত জড়িয়ে গেছে" এবং "মাথা উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে"-এর
অর্থ হচ্ছে , অহংকার বশত ঘাড় তেড়া করে দাঁড়িয়ে থাকা। আল্লাহ বলছেন, তাদের জিদ ও হঠকারিতাকে আমি তাদের ঘাড়ের বেড়িতে পরিণত করে দিয়েছি
এবং এ অহংকার ও আত্মম্ভরিতায় তারা লিপ্ত রয়েছে তার ফলে তাদের ঘাড় এমনভাবে বাঁকা
হয়ে গেছে যে, কোন উজ্জ্বলতর সত্য তাদের সামনে এসে গেলেও তারা সেদিকে ভ্রুক্ষেপও
করবে না।
৪। আমি তাদের সামনে একটি দেয়াল এবং পেছনে একটি দেয়াল দাঁড় করিয়ে দিয়েছি৷ আমি তাদেরকে ঢেকে দিয়েছি, এখন তারা কিছুই দেখতে পায় না৷
(৩৬-ইয়াসিন :৯) আমি তাদের সামনে একটি দেয়াল এবং পেছনে একটি দেয়াল
দাঁড় করিয়ে দিয়েছি৷ আমি তাদেরকে ঢেকে দিয়েছি,
এখন তারা কিছুই দেখতে পায় না৷৭
৭. সামনে
একটি দেয়াল ও পেছনে একটি দেয়াল দাঁড় করিয়ে দেবার অর্থ হচ্ছে এই যে, এ হঠকারিতা ও অহংকারের স্বাভাবিক ফলশ্রুতিতে তারা পূর্বের র ইতিহাস থেকে কোন শিক্ষা গ্রহণ করে না
এবং ভবিষ্যত পরিণামের কথাও চিন্তা করে না। তাদের অন্ধ স্বার্থপ্রীতি তাদেরকে এমনভাবে চারদিক থেকে ঢেকে নিয়েছে এবং তাদের বিভ্রান্তি এমনভাবে তাদের চোখের ওপর
আচ্ছাদন টেনে দিয়েছেন যার ফলে প্রত্যেক সুস্থবোধ সম্পন্ন ও অন্ধ স্বার্থপ্রীতিহীন
মানুষ যে উন্মুক্ত সত্য দেখতে পায় তা তারা দেখতে পায় না।
৫। তুমি তাদেরকে সতর্ক করো বা না করো তা তাদের জন্য সমান, তারা মানবে না৷
৮. এর অর্থ এ নয় যে, এ অবস্থায় সত্যদীনের কথা প্রচার করা অর্থহীন। বরং এর অর্থ হচ্ছে, তোমার সাধারণ প্রচার সব ধরনের মানুষের কাছে পৌছে যায়। তাদের মধ্য
থেকে কিছু লোকের কথা ওপরে
বর্ণনা করা হয়েছে এবং কিছু
লোকের কথা সামনের দিকের আয়াতে আসছে। প্রথম ধরনের লোকদের মুখোমুখি হয়ে যখন দেখবে তারা অস্বীকার, অহংকার, বিদ্বেষ ও বিরোধিতার ওপর স্থির হয়ে আছে তখন তাদের পেছনে লেগে থাকার দরকার নেই। কিন্তু তাদের এ আচরণে হতাশ
হয়েও মনোবল হারিয়ে নিজের কাজ
ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ো না। কারণ, তুমি জানো না , মানুষের এ ভীড়ের মধ্যে আল্লাহর
এমন বান্দা কোথায় আছে যে উপদেশ গ্রহণ করবে এবং আল্লাহকে ভয় করে সরল সঠিক পথে চলে আসবে। তোমর সত্য
প্রচারের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে এ
দ্বিতীয় ধরনের লোকদের সন্ধান
করা এবং তাদেরকে ছাঁটাই বাছাই করে বের করে আনা। একদিকে হঠকারীদেরকে ত্যাগ করে
যেতে হবে এবং অন্যদিকে এ মূল্যবান সম্পদ হস্তগত করতে হবে।
কুরাইশ সরদারদের জন্য ইঙ্গিতে সতর্কীকরণ :
(৩৮-সোয়াদ:৮৪) আল্লাহ বললেন, “তাহলে এটিই সত্য এবং আমি সত্যই বলে থাকি যে, ৮৫) আমি তোমাকে ৬৯ এবং এসব লোকদের মধ্য থেকে যারা তোমার আনুগত্য করবে তাদের সবাইকে দিয়ে জাহান্নাম ভরে দেবো৷” ৭০
৬৯. " তোমাকে দিয়ে " শব্দের মাধ্যমে কেবলমাত্র ব্যক্তি ইবলিসকেই সম্বোধন করা হয়নি বরং সমগ্র জিন
জাতিকে
সম্বোধন করা হয়েছে। অর্থাৎ ইবলিস ও তার সমগ্র
শয়তান দল যারা তার সাথে মিলে মানুষ জাতিকে গোমরাহ করার কাজে লিপ্ত থাকবে।
৭০) এ পুরো কাহিনীটি শুনানো হয় কুরাইশ সরদারদের একটি কথার জবাবে। তারা বলেঃ
أَأُنْزِلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ مِنْ بَيْنِنَا
“আমাদের মধ্যে কি এ একজনই লোক রয়ে গিয়েছিল যার ওপর যিকির, নাযিল করা হয়েছে?”
৯ ও ১০ নম্বর আয়াতে যা বলা হয়েছে তাই ছিল এর জবাব। সেখানে বলা হয়েছে, “তোমরা কি আল্লাহর রহমতের ভাণ্ডারের মালিক, তোমরা কি আকাশ ও পৃথিবীর বাদশাহ এবং কাকে আল্লাহর নবী করা হবে ও কাকে করা হবে না এ ফায়সালা করা কি তোমাদের কাজ? ” দ্বিতীয় জবাব এবং এর মধ্যে কুরাইশ সরদারদেরকে যা বলা হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মোকাবিলায় ইবলিসের হিংসা ও অহংকারের সাথে মিলে যায়। ইবলিসও আল্লাহ যাকে চান তাকে খলিফা বা প্রতিনিধি করবেন তাঁর এ অধিকার মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল। সে আদমের সামনে মাথা নত করার হুকুম মানেনি এবং তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য করার হুকুম মানছো না। তার সাথে তোমাদের এ সামঞ্জস্য কেবলমাত্র এখানেই শেষ হয়ে যাবে না বরং তোমাদের পরিণামও আবার তাই হবে যা তার জন্য নির্ধারিত হয়ে গেছে অর্থাৎ দুনিয়ায় আল্লাহর লানত এবং আখেরাতে জাহান্নামের আগুন।
এ সঙ্গে এ কাহিনীর আওতায় আরো দু’টি কথাও বুঝানো হয়েছে। এক, এ দুনিয়ায় যে মানুষই আল্লাহর নাফরমানি করছে সে আসলে তার সে চিরন্তন শত্রুর ফাঁদে আটকে যাচ্ছে,
যে সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই মানবজাতিকে ফুসলিয়ে কুপথে পরিচালনা করার স্থির সিদ্ধান্ত করে রেখেছে। দুই, যে ব্যক্তি অহংকারের কারণে আল্লাহর নাফরমানি করে এবং তারপর নিজের এ নাফরমানি করার নীতির ওপর জিদ ধরে থাকে, আল্লাহর দৃষ্টিতে সে চরম ঘৃণিত। আল্লাহর কাছে এ ধরনের মানুষের কোন ক্ষমা নেই।
সামান্য সময অতিবাহিত হবার পরই তোমরা জানতে পারবে :
৭৩. অর্থাৎ
তোমাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকবে তারা কয়েক বছরের মধ্যে স্বচক্ষে দেখে নেবে আমি যা বলছি তা
সঠিক প্রমানিত হবেই । আর যারা মরে যাবে তারা মৃত্যুর দুয়ার অতিক্রম করার
পরপরই জানতে পারবে , আমি যা কিছু বলছি তা-ই প্রকৃত সত্য।
====================================
====================================
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন