বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ সমূহ :
বিস্তারিত দেখুন : ক > কুরআন ও বিজ্ঞান > বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লাহর অস্তিত্ব ও আখিরাতের সত্যতার প্রমাণ ।
১। মানুষ সৃষ্টি
: আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ :
(৩০-রূম: ২০) তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে,
তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন
মাটি থেকে তাঁরপর সহসা তোমরা হলে মানুষ, (
পৃথিবীর বুকে) ছড়িয়ে পড়ছো৷ ২৭
২৬ . মনে রাখতে হবে এখান থেকে রুকুর শেষ অবধি মহান
আল্লাহর যেসব নিদর্শন বর্ণনা করা হচ্ছে, সেগুলো তো একদিকে বক্তব্য পরম্পরার সাথে
সম্পর্ক রেখে পরকালীন জীবনের সম্ভাবনা ও অস্তিত্বশীলতাঁর কথা
প্রমাণ করে এবং
অন্যদিকে এ নিদর্শনগুলোই প্রমাণ করে যে, এ বিশ্ব- জাহান ইলাহ বিহীন নয় বরং এর ইলাহও বহু নয় বরং
এক ও একক ইলাহই এর স্রষ্টা, পরিচালক, মালিক ও শাসক। তিনি ছাড়া মানুষের আর কোন মাবুদ হওয়া উচিত নয়। অনুরূপভাবে এ
রুকুটি বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে পূর্বের ও পরের উভয়
ভাষণের সাথে সম্পৃক্ত।
২৭ . অর্থাৎ মানুষের সৃষ্টি রহস্য এ ছাড়া আর কি
যে, কয়েকটি নিষ্প্রাণ
উপাদানের সমাহার, যেগুলো এ পৃথিবীর বুকে পাওয়া যায়। যেমন কিছু
কার্বন, ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম এবং এ ধরনের আরো কিছু উপাদান। এগুলোর রাসায়নিক
সংযোগের মাধ্যমে মানুষ নামক একটি বিস্ময়কর সত্ত্বা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তাঁর মধ্যে
সৃষ্টি করা হয়েছে আবেগ, অনুভূতি, চেতনা, বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তা- কল্পনার এমন সব অদ্ভূত শক্তি যাদের কোন একটির উৎসও
তাঁর মৌলিক উপাদানগুলোর মধ্যে খূঁজে পাওয়া যেতে পারে
না। তাঁরপর শুধু এতটুকুই নয় যে, হঠাৎ একজন মানুষ এমনি ধরনের এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়ে
দাঁড়িয়ে গেছে বরং তাঁর মধ্যে এমন সব অদ্ভুত প্রজনন শক্তিও সৃষ্টি করে দেয়া
হয়েছে যার বদৌলতে কোটি কোটি মানুষ সে একই কাঠামো এবং যোগ্যতাঁর অধিকারী হয়ে
অসংখ্য উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এবং সীমাসংখ্যাহীন ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ধারক
হিসেবে বের হয়ে আসছে । তোমার বুদ্ধি কি এ সাক্ষ্য দেয়, এ চূড়ান্ত জ্ঞানময় সৃষ্টি
কোন জ্ঞানী স্রষ্টার সৃষ্টিকর্ম ছাড়াই আপনা আপনিই অস্তিত্বশীল হয়েছে ৷ তুমি কি
সজ্ঞানে ও সচেতন অবস্থায় একথা বলতে পারো, মানুষ সৃষ্টির মতো মহত্তম
পরিকল্পনা ,তাকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করা এবং পৃথিবী ও আকাশের সংখ্যাব্যতীত শক্তিকে
মানব জীবন গঠনের উপযোগী করে দেয়া, এগুলো কি বহু ইলাহর চিন্তা ও ব্যবস্থাপনার ফল
হতে পারে ৷ আর তোমরা যখন মনে করতে থাকো, যে আল্লাহ মানুষকে নিরেট অনস্তিত্ব
থেকে অস্তিত্ব দান করেছেন তিনি সেই মানুষকে মৃত্যু দান করার পর পুনরায় জীবিত করতে
পারবেন না, তখন তোমাদের মস্তিষ্ক কি সঠিক অবস্থায় থাকে ৷
২।
নারী
সৃষ্টি
: আল্লাহর
অস্তিত্বের
প্রমাণ :
(৩০-রূম: ২১) আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে
রয়েছে , তিনি তোমাদের জন্য
তোমাদেরই জাতি থেকে সৃষ্টি করেছেন স্ত্রীগণকে, ২৮ যাতে তোমরা তাদের
কাছে প্রশান্তি লাভ করো ২৯ এবং তোমাদের মধ্যে
ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন৷ ৩০ অবশ্যই এর মধ্যে বহু নিদর্শন রয়েছে
তাদের জন্য যারা চিন্তা- ভাবনা করে৷
২৮ . অর্থাৎ স্রষ্টার প্রজ্ঞার পূর্ণতা
হচ্ছে এই যে, তিনি মানুষকে
শুধুমাত্র একটি জাতি (sexes) সৃষ্টি করেননি বরং তাকে
দুটি জাতির আকারে সৃষ্টি করেছেন। মানবিকতাঁর দিক দিয়ে তারা একই পর্যায়ভুক্ত।
তাদের সৃষ্টির মূল ফরমুলাও এক।কিন্তু তারা উভয়ই পরস্পর থেকে ভিন্ন শারীরিক আকৃতি, মানসিক ও আত্মিক গুণাবলী এবং আবেগ- অনুভূতি ও উদ্যোগ নিয়ে
জন্মলাভ করে। আবার তাদের
মধ্যে এমন বিস্ময়কর সম্বন্ধ ও সামঞ্জস্য সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে যার ফলে তারা
প্রত্যেকে পুরোপুরি অন্যের জোড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যেকের শরীর এবং প্রবৃত্তি ও
উদ্যোগসমূহ অন্যের শারীরিক ও প্রবৃত্তির দাবীসমূহের পরিপূর্ণ জবাব। এ ছাড়াও সেই প্রাজ্ঞ
স্রষ্টা ও উভয় জাতির লোকদেরকে সৃষ্টির সূচনা থেকেই বরাবর ও আনুপাতিক হারে সৃষ্টি করে চলবেন। আজ পর্যন্ত কখনো দুনিয়ার
কোন জাতির মধ্যে বা কোন এলাকায় কেবলমাত্র পুত্র সন্তানই জন্মলাভ করে চলছে এমন কথাও শোনা যায় নি। এটা
এমন একটা জিনিস যার
মধ্যে কোন মানুষের হস্তক্ষেপ বা বুদ্ধি- কৌশল প্রয়োগের সামান্যতম অবকাশই নেই। মানুষ
এ ব্যাপারে সামান্যতমও প্রভাব বিস্তার করতে পারে না যে, মেয়েরা অনবরত এমনি মেয়েলী বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মলাভ করতে থাকবে এবং ছেলেরা অনবরত এমন পুরুষালী
বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মলাভ করতে থাকবে যা তাদের পরস্পরকে যথার্থ জোড়ায় পরিণত করবে। আর নারী ও
পুরুষের জন্ম এমনি ধারাবাহিকভাবে একটি আনুপাতিক হারে হয়ে যেতে থাকবে , এ ব্যাপারে প্রভাব বিস্তার করার কোন মাধ্যম তাঁর নেই। হাজার
হাজার বছর থেকে কোটি কোটি মানুষের
জন্মলাভ এ কৌশল ও ব্যবস্থার এমনই সুসামঞ্জস্য পদ্ধতিতে কার্যকর থাকা কখনো নিছক
আকস্মিক ঘটনা হতে পারে না আবার বহু ইলাহর সম্মিলিত ব্যবস্থাপনার ফলও এটা নয়। এ জিনিসটি
সুস্পষ্টভাবে একথা প্রমাণ করে যে, একজন বিজ্ঞানী আর শুধুমাত্র একজন মহা বিজ্ঞানী স্রষ্টাই তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞান ও শক্তির মাধ্যমে শুরুতে
পুরুষ ও নারীর একটি
সর্বাধিক উপযোগী ডিজাইন তৈরি করেন। তাঁরপর তিনি এ ডিজাইন অনুযায়ী অসংখ্য পুরুষ ও অসংখ্য
নারীর তাদের পৃথক ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য সহকারে সারা দুনিয়ায় একটি আনুপাতিক হারে
জন্মলাভ করার ব্যবস্থা করেন।
২৯ . অর্থাৎ এটা কোন অপরিকল্পিত
ব্যবস্থা নয়। বরং স্রষ্টা নিজেই পরিকল্পিতভাবে এ ব্যবস্থা করেছেন যার ফলে পুরুষ তাঁর
প্রাকৃতিক দাবী নারীর কাছে এবং নারী তাঁর প্রাকৃতিক চাহিদা পুরুষের কাছে লাভ করবে এবং
তারা উভয়ে পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত থেকেই প্রশান্তি ও সুখ লাভ করবে। এ বিজ্ঞানময়
ব্যবস্থাপনাকে স্রষ্টা একদিকে মানব বংশধারা অব্যাহত থাকার এবং অন্যদিকে মানবিক
সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে অস্তিত্ব দান করার মাধ্যমে পরিণত করেছেন। যদি এ দুটি জাতিকে
নিছক দুটি পৃথক ডিজাইনে তৈরি করা হতো এবং তাদের মধ্যে এমন অস্থিরতা সৃষ্টি না করা হতো
, যা তাদের
পারস্পরিক সংযোগ ও সম্পর্ক ছাড়া প্রশান্তিতে পরিণত হতে পারতো না, তাহলে সম্ভবত ছাগল ভেড়ার মতো মানুষের বংশধারাও এগিয়ে যেতো কিন্তু তাদের সাহায্যে
কোন সভ্যতা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব লাভ করার কোন সম্ভাবনাই থাকতো না। স্রষ্টা নিজের
জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাহায্যে পুরুষ ও নারীর জন্য এমন পরস্পরের চাহিদা, তৃষ্ণা ও অস্থিরতাঁর অবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছেন যার ফলে
তারা উভয়ে মিলে একসাথে না থাকলে শান্তি ও সুখ লাভ করতে পারে না। সমগ্র প্রাণীজগতের বিপরীতে মানব জাতির
মধ্যে এটিই হচ্ছে সভ্যতা
ও সংস্কৃতির উন্মেষ ও বিকাশ লাভের মৌলিক কারণ। এ শান্তির অন্বেষায় তাদেরকে একত্রে ঘর বাঁধতে বাধ্য করে। এরি বদৌলতে
পরিবার ও গোত্র অস্তিত্ব লাভ করে। এর ফলে মানুষের জীবনে সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটে। এ বিকাশে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক
যোগ্যতা অবশ্যই সহায়ক হয়েছে।কিন্তু তা তাঁর আসল উদ্যোক্তা নয়। আসল উদ্যোক্তা হচ্ছে এ
অস্থিরতা, যাকে পুরুষ ও
নারীর অস্তিত্বের মধ্যে সংস্থাপিত করে তাদেরকে 'ঘর' বাঁধতে বাধ্য করা হয়েছে। কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি এ কথা ভাবতে
পারেন যে , এ বিপুল প্রজ্ঞা
প্রকৃতির অন্ধ শক্তিসমূহ থেকে হঠাৎ এমনিই সৃষ্টি হয়ে গেছে ৷ অথবা বহু সংখ্যক ইলাহ
কি এমনি ধরনের একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারতো, যার ফলে তারা এ গভীর জ্ঞানময় উদ্দেশ্য সামনে রেখে হাজার হাজার বছর থেকে অনবরত অসংখ্য পুরুষ ও
নারীকে এ বিশেষ অস্থিরতা
সহকারে সৃষ্টি করে যেতে থাকতো ৷ এ তো একজন জ্ঞানীর এবং মাত্র একজন জ্ঞানীরই প্রজ্ঞার
সুস্পষ্ট নিদর্শন। কেবলমাত্র বুদ্ধিভ্রষ্ট ব্যক্তিই এটি দেখতে অস্বীকার করতে
পারে।
৩০ . ভালোবাসা বলতে এখানে কামশক্তি
ভালোবাসার (sexual love ) কথা বলা হয়েছে ।
নারী ও পুরুষের মধ্যে এটি আকর্ষণের প্রাথমিক উদ্যোক্তায় পরিণত হয়। তাঁরপর তাদেরকে পরস্পরের সাথে সংলগ্ন
করে রাখে। আর 'রহমত' তথা দয়া মানে হচ্ছে এমন একটি আত্মিক সম্পর্ক , যা স্বামী- স্ত্রীর জীবনে পর্যায়ক্রমে বিকাশ লাভ করে। এর বদৌলতে তারা দু'জনে দু'জনার কল্যাণকাংখী , দু'জনের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং উভয়ের সুখে দুঃখে শরীক হয়ে
যায়। এমনকি এমন এক সময় আসে যখন কামসিক্ত ভালোবাসা পিছনে পড়ে থাকে এবং বার্ধক্যে এ জীবনসাথী যৌবনকালের চাইতে অনেক বেশি
অগ্রসর হয়ে পরস্পরের জন্য দয়া, স্নেহ ও মমতাঁর পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে থাকে। মানুষের মধ্যে শুরুতেই যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল তাকে সাহায্য করার
জন্য স্রষ্টা মানুষের
মধ্যে এ দুটি ইতিবাচক শক্তি সৃষ্টি করে দেন। এ অস্থিরতা তো শুধুমাত্র শান্তির প্রত্যাশী এবং এর সন্ধানে সে নারী ও
পুরুষকে পরস্পরের দিকে নিয়ে যায়। এরপর এ দুটি শক্তি অগ্রসর হয়ে তাদের মধ্যে স্থায়ী বন্ধুত্বের এমন একটি
সম্পর্ক জুড়ে দেয় যা দুটি
পৃথক পরিবেশে লালিত আগন্তুকদেরকে একসাথে মিলিয়ে গভীরভাবে সংযুক্ত করে দেয়।এ সংযোগের
ফলে সারা জীবনে তারা মাঝ দরিয়ায় নিজেদের নৌকা একসাথে চালাতে থাকে। একথা সুস্পষ্ট , কোটি কোটি মানুষ তাদের জীবনে এই যে ভালোবাসা ও দয়ার অভিজ্ঞতা লাভ করছে এগুলো
কোন নিরেট বস্তুনয়। এগুলোকে ওজন ও পরিমাপ করা যেতে পারে না। মানুষের শারীরিক গঠনে যেসব
উপাদানের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে তাদের মধ্যে কোথাও এদের উৎস চিহ্নিত করা যেতে পারে না।
কোন ল্যাবরেটরীতেও এদের জন্ম ও বিকাশ সাধনের কারণসমূহ অনুসন্ধান করা যেতে পারে না।
এ ছাড়া এর আর কোন ব্যাখ্যাই করা যেতে পারে না যে, একজন প্রাজ্ঞ স্রষ্টা
স্বেচ্ছাকৃতভাবে একটি উদ্দেশ্য সামনে রেখে পূর্ণ সামঞ্জস্য সহকারে মানুষের মধ্যে তা সংস্থাপন
করে দিয়েছেন।
৩। আকাশ ও পৃথিবীর বৈচিত্রময়তার সৃষ্টি
: আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ :
(৩০-রূম: ২২) আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশ ও
পৃথিবীর সৃষ্টি ৩১ এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের পার্থক্য৷ ৩২
অবশ্যই তাঁর মধ্যে
বহু নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানবানদের জন্য৷
৩১ . অর্থাৎ তাদের অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব লাভ
করা, একটি অপরিবর্তনীয়
নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং অসংখ্য শক্তির পরম সামঞ্জস্য
ও ভারসাম্য সহকারে কাজ করা - এগুলো নিজের অভ্যন্তরে এ বিষয়ের এমন বহু নিদর্শন রাখে
যা থেকে জানা যায় যে, এ সমগ্র বিশ্ব- জাহানকে মাত্র একজন স্রষ্টাই অস্তিত্ব দান
করেছেন এবং তিনিই এ বিশাল ব্যবস্থা পরিচালনা করেছেন। একদিকে যদি একথা চিন্তা করা
যায় যে, এ প্রাথমিক শক্তি (Energy) কোথা থেকে এসে বস্তুর আকার ধারণ করেছে ৷ বস্তুর এ বিভিন্ন উপাদান কেমন করে
গঠিত হয়েছে এ উপাদানগুলোকে এহেন বৈজ্ঞানিক কৌশলে সংমিশ্রিত করে বিস্ময়কর সামঞ্জস্য সহকারে এ অত্যদ্ভূত বিশ্বব্যবস্থা গঠিত হয়েছে কেমন করে ৷ এখন কোটি কোটি বছর ধরে একটি মহাপরাক্রমশালী প্রাকৃতিক আইনের আওতাধীনে এ ব্যবস্থাটি কিভাবে চলছে ৷ এ
অবস্থায় প্রত্যেক নিরপেক্ষ বুদ্ধিবৃত্তি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছবে যে, এসব কিছু একজন সর্বজ্ঞ ও মহাজ্ঞানীর প্রবল ইচ্ছাশক্তি ছাড়া নিছক ঘটনাক্রমে বা অকস্মাৎ ঘটতে পারে না।
আবার অন্যদিকে যদি দেখা যায় যে, পৃথিবী থেকে নিয়ে বিশ্ব- জাহানের দূরবর্তী নক্ষত্রগুলো পর্যন্ত সবাই একই ধরনের
উপাদানে গঠিত এবং একই প্রাকৃতিক আইনের নিয়ন্ত্রণে তারা চলছে, তাহলে হঠকারিতামুক্ত প্রতিটি
বুদ্ধিবৃত্তিই নিসন্দেহে একথা স্বীকার করবে যে, এ সবকিছু বহু ইলাহর
কর্মকুশলতা নয় বরং একজন ইলাহ এ সমগ্র বিশ্ব- জাহানে স্রষ্টা ও প্রতিপালক।
৩২ . অর্থাৎ যদিও তোমাদের বাকশক্তি সমান নয়, মুখ ও জিহ্বার গঠনেও কোন
ফারাক নেই এবং মস্তিষ্কের গঠনাকৃতিও একই রূপ তবুও পৃথিবীর বিভিন্ন
অংশে তোমাদের ভাষা বিভিন্ন হয়ে গেছে। তাঁরপর একই ভাষায় যারা কথা বলে তাদের বিভিন্ন
শহর ও জনপদের ভাষাও আলাদা। আবার আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রত্যেক ব্যক্তির বলার রীতি,
শব্দের উচ্চারণ এবং
আলাপ- আলোচনার পদ্ধতি আলাদা। অনুরূপভাবে তোমাদের
সৃষ্টি উপাদান এবং তোমাদের গঠন প্রক্রিয়া একই।কিন্তু তোমাদের বর্ণ এত বেশি
বিভিন্ন যে, একেক জাতির কথা না হয় বাদই দিলাম কিন্তু একই বাপ- মায়ের দুটি সন্তানের বর্ণও
একই হয় না। এখানে নমুনা হিসেবে কেবলমাত্র দুটি জিনিসের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা
হয়েছে।কিন্তু এ দিক থেকে সামনে অগ্রসর হয়ে দেখুন , দুনিয়ায় সকল দিকেই আপনি এত বেশি বৈচিত্র্য (varaity)দেখতে পাবেন যে, তাদের সবগুলোকে একত্র করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। মানুষ, পশু, উদ্ভিদ এবং অন্যান্য সমস্ত জিনিসের যে কোন একটি শ্রেণীকে নেয়া হোক , দেখা যাবে তাদের প্রতিটি
এককের মধ্যে মৌলিক একাত্মতা সত্ত্বেও অসংখ্য বিভিন্নতা বিরাজ
করছে। এমন কি কোন এক শ্রেণীর একটি এককও অন্য একটি এককের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যশীল
নয়। এমন কি একটি গাছের দুটি পাতাঁর মধ্যেও পূর্ণ সাদৃশ্য পাওয়া যায় না। এ
জিনিসটি পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে যে, এ দুনিয়ায় এমন কোন কারখানা নেই যেখানে
স্বয়ংক্রিয় মেশিনপত্র চলছে এবং বিপুল উৎপাদনের (Massproduction) পদ্ধতিতে সব রকমের জিনিসের
এক একটি ছাঁচ থেকে ঢালাই হয়ে একই ধরনের জিনিস বের হয়ে আসছে। বরং এখানে একজন
জবরদস্ত কারিগর কাজ করছেন যিনি প্রত্যেকটি জিনিসকে পূর্ণ ব্যক্তিগত আগ্রহ ও উদ্যোগ
সহকারে একটি নতুন ডিজাইনে, নতুন নকশায় ও কারুকাজে, নতুন সৌষ্ঠবে এবং নতুন গুণাবলী সহকারে তৈরি করেন। তাঁর তৈরি করা প্রত্যেকটি জিনিস
স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাঁর উদ্ভাবন ক্ষমতা সবসময় সব জিনিসের একটি নতুন মডেল
বের করে চলেছে। তাঁর শিল্পকারিতা একটি ডিজাইনকে দ্বিতীয়বার সামনে নিয়ে আসাকে নিজের পূর্ণতাঁর জন্য অবমাননাকর মনে করে। যে ব্যক্তিই যে বিস্ময়কর দৃশ্য চোখ মেলে
দেখবে সে কখনো এ ধরনের মূর্খতা সুলভ ধারণা পোষণ করতে পারে না যে, এ বিশ্ব- জাহানের স্রষ্টা একবার এ কারখানাটি চালিয়ে দিয়ে তাঁরপর নিজে কোথাও গিয়ে ঘুমাচ্ছেন,
তিনি যে প্রতি মুহূর্তে সৃষ্টি করে যাচ্ছেন এবং নিজের সৃষ্ট প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর ব্যক্তিগত দৃষ্টি দিচ্ছেন, এতো একথার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
৪। ঘুম সৃষ্টি
: আল্লাহর
অস্তিত্বের
প্রমাণ:
(৩০-রূম: ২৩) আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে তোমাদের
রাতে ও দিনে ঘুমানো এবং তোমাদের তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করা৷ ৩৩
অবশ্যই এর মধ্যে
রয়েছে বহু নিদর্শন এমনসব লোকদের জন্য যারা (গভীর মনোযোগ
সহকারে) শোনে৷
৩৩ . অনুগ্রহ সন্ধান করা অর্থ জীবিকার জন্য সংগ্রাম ও
প্রচেষ্টা চালানো। মানুষ যদিও সাধারণত রাতের বেলা ঘুমায় এবং দিনের বেলায়
জীবিকার জন্য চেষ্টা- মেহনত করে তবুও শতকরা একশো ভাগ লোক এমনটি করে না। বরং বহুলোক
দিনের বেলায় ঘুমায় এবং রাতে জীবিকা উপার্জনের জন্য মেহনত করে। তাই রাত দিনকে একসাথে
উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এ দুটি সময়ে তোমরা ঘুমাও এবং নিজেদের জীবিকা উপার্জনের
জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকো।
এটিও এমন ধরনের নিদর্শনাবলীর অন্যতম যেগুলো থেকে একজন মহাজ্ঞানী স্রষ্টার ব্যবস্থাপনার সন্ধান পাওয়া যায়। বরং এ ছাড়াও এ জিনিসটি এও
চিহ্নিত করে যে,
তিনি নিছক স্রষ্টা নন
বরং নিজের সৃষ্টির প্রতি তিনি বড়ই করুণাশীল ও স্নেহময় এবং তাঁর প্রয়োজন ও কল্যাণের জন্য তাঁর চেয়ে বেশি তিনি চিন্তা করেন।
মানুষ দুনিয়ায় অনবরত পরিশ্রম করতে পারে না। বরং প্রত্যেকবার
কয়েক ঘন্টা মেহনত করার শক্তি পাবে। এ উদ্দেশ্যে
মহাজ্ঞানী ও করুণাময় ও স্রষ্টা মানুষের মধ্যে কেবলমাত্র ক্লান্তির অনুভূতি এবং কেবলমাত্র বিশ্রামের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেই
ক্ষান্ত হননি বরং '
নিদ্রার এমন একটি জবরদস্ত
চাহিদা তাঁর অস্তিত্বের মধ্যে রেখে দিয়েছেন যার ফলে তাঁর ইচ্ছা ছাড়াই এমন কি তাঁর বিরোধিতা সত্ত্বেও আপনা আপনিই কয়েক
ঘন্টার জাগরণ ও মেহনতের পর তা তাকে পাকড়াও করে,
কয়েক ঘন্টা বিশ্রাম নিতে তাকে বাধ্য করে এবং প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে আপনা আপনিই তাকে ত্যাগ করে । এ নিদ্রার স্বরূপ ও অবস্থা এবং
এর মৌল কারণগুলো আজো মানুষ অনুধাবন করতে পারেনি। এটি অবশ্যই
জন্মগতভাবে মানুষের প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী হয়ে থাকে,
এটা একথার সাক্ষ পেশ করার জন্য যথেষ্ট যে,
এটি কোন আকষ্মিক
ঘটনা নয় বরং কোন মহাজ্ঞানী সত্তা একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা
অনুসারে এ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যে
একটি বিরাট জ্ঞান,
কল্যাণ ও উদ্দেশ্যমুখীতা পরিষ্কার সক্রিয় দেখা যায়। এ ছাড়াও এ নিদ্রা একথারও সাক্ষবহ যে,
যিনি মানুষের
মধ্যে এ বাধ্যতামূলক উদ্যোগ রেখে দিয়েছেন তিনি
নিজেই মানুষের জন্য তাঁর চেয়ে বেশি কল্যাণকামী। অন্যথায় মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে নিদ্রার বিরোধিতা করে এবং জোরপূর্বক জেগে থেকে
এবং অনবরত কাজ করে কেবল নিজের কর্মশক্তিই
নয় জীবনী শক্তিও ক্ষয় করে।
তাঁরপর জীবিকার অন্বেষণের জন্য " আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান" শব্দাবলীর
ব্যবহার করার মাধ্যমে নিদর্শনাবলীর অন্য একটি ধারাবাহিকতাঁর প্রতি
ইঙ্গিত করা হয়েছে। যদি পৃথিবী ও আকাশের
বিপুল ও অগণিত শক্তি সম্ভারকে জীবিকার কার্যকারণ ও উপায় উপকরণ সৃষ্টি করার কাজে না লাগিয়ে দেয়া হতো এবং পৃথিবীতে মানুষের
জন্য জীবিকার অসংখ্য উপায়- উপকরণ সৃষ্টি না করা হতো,
তাহলে মানুষ এ
জীবিকার সন্ধানইবা কোথায় করতে পারতো। শুধুমাত্র এতটুকুই
নয় বরং জীবিকার এ অনুসন্ধান এবং তা উপার্জন এমন অবস্থায়ও সম্ভব হতো না যদি এ কাজের জন্য মানুষকে সর্বাধিক উপযোগী অঙ্গ-
প্রত্যঙ্গ এবং দৈহিক ও মানসিক যোগ্যতা না
দান করা হতো,
কাজেই মানুষের মধ্যে জীবিকা অন্বেষণের যোগ্যতা এবং তাঁর অস্তিত্বের বাইরে জীবিকার উপকরণাদি বিদ্যমান থাকা
পরিষ্কারভাবে একজন দয়াশীল ও মর্যাদাবান সত্তার
অস্তিত্বের সন্ধান দেয়। বুদ্ধিবৃত্তি অসুস্থ না হলে কখনো কেউ এ ধারণা করতে পারতো না যে,
এ সবকিছু অকস্মাৎ
হয়ে গেছে অথবা এসব বহু ইলাহর ইলাহিত্বের ফল কিংবা কোন নির্দয়
অন্ধশক্তি এ অনুগ্রহ ও দানের উৎস।
৫। বিদ্যুৎ চমক ও বৃষ্টি : আল্লাহর
অস্তিত্বের
প্রমাণ :
(৩০-রূম: ২৪) আর তাঁর নিদর্শনাবলীর অন্তরভুক্ত হচ্ছে,
তিনি তোমাদের দেখান
বিদ্যুৎচমক ভীতি ও লোভ সহকারে৷ ৩৪
আর আকাশে থেকে পানি
বর্ষণ করেন এবং তাঁরপর এর মাধ্যমে জমিকে তাঁর মৃত্যুর
পর জীবন দান করেন৷ ৩৫ অবশ্যই এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে এমন লোকদের জন্য যারা বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করে৷
৩৪ . অর্থাৎ তাঁর মেঘ গর্জন ও বিদ্যুৎ চমক থেকে তো
একদিকে আশা হয় বৃষ্টি হবে এবং মাঠ শস্যে ভরে যাবে।কিন্তু সাথে সাথে এ ভয়ও
জাগে যে, কোথাও বিজলী পড়ে বা অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়ে বানের তোড়ে সবকিছু ভাসিয়ে না
নিয়ে যায়।
৩৫ . এ জিনিসটি একদিকে মৃত্যু পরের জীবনের দিকে
অঙ্গুলি নির্দেশ করে এবং অন্যদিকে এ জিনিসটিই একথা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ আছেন এবং এক আল্লাহই
পৃথিবী ও আকাশের পরিচালক ও ব্যবস্থাপক। জমি থেকে যা উৎপন্ন হয় তাঁর ওপর
নির্ভর করে পৃথিবীর অসংখ্য সৃষ্টির খাদ্য। এ উৎপাদন নির্ভর করে জমির উর্বরতা ও
শস্য উৎপাদন ক্ষমতাঁর ওপর। আবার এ উৎপাদন ক্ষমতা নির্ভর করে বৃষ্টিপাতের ওপর। সরাসরি
জমির ওপর এ বৃষ্টিপাত হতে পারে। অথবা পানির বিশাল ভাণ্ডার জমির উপরিভাগে স্থান
লাভ করতে পারে। কিংবা ভূগর্ভস্থ ঝরণা ও কূপের রূপলাভ করতে পারে। অথবা পাহাড়ের ওপর
বরফের আকারে জমাট বদ্ধ হয়ে নদ-নদীর সাহায্যে প্রবাহিত হতে পারে। তাঁরপর এ বৃষ্টিপাত
আবার নির্ভর করে সূর্যের উত্তাপ, মওসুম পরিবর্তন, মহাশূন্যের তাপমাত্রা ও শৈত্য, বাতাসের আবর্তন এবং এমন বিদ্যুতের ওপর যা মেঘমালা থেকে বৃষ্টি বর্ষণের
ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করে। এই সঙ্গে বৃষ্টির পানির মধ্যে এক ধরনের প্রাকৃতিক লবণাক্ততাঁরও সৃষ্টি করে দেয়। পৃথিবী থেকে নিয়ে আকাশ পর্যন্ত এসব বিভিন্ন জিনিসের মধ্যে সম্পর্ক ও সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া,
তাঁরপর এসবের অসংখ্য ও বিচিত্র ধরনের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনের জন্য সুস্পষ্টভাবে উপযোগী
হওয়া এবং হাজার হাজার লাখো লাখো বছর পর্যন্ত এদের পূর্ণ একাত্মতা সহকারে অনবরত সহযোগিতাঁর ভূমিকা পালন করে যেতে থাকা, এ সবকিছু কি নিছক ঘটনাক্রমিক
হতে পারে ৷ এ সবকিছু কি একজন স্রষ্টার জ্ঞানবত্তা, তাঁর সুচিন্তিত পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী কৌশল ও ব্যবস্থাপনা ছাড়াই হয়ে গেছে ৷ এ সবকিছু কি একথার প্রমাণ নয় যে, পৃথিবী , সূর্য , বাতাস, পানি, উত্তাপ ও শৈত্য এবং পৃথিবীর
যাবতীয় সৃষ্টির স্রষ্টা ও রব একজনই ৷
৬। পৃথিবীতে আল্লাহর বিধানই প্রতিষ্ঠিত আছে,
যাকে যে নিয়মে,
যে ভাবে
সৃষ্টি করা হয়েছে,
সৃষ্টির বিরুদ্ধাচরণ করা কারো পক্ষেই সম্ভবপর নয়,
আল্লাহর হুকুম-ই প্রতিষ্ঠিত আছে
:
(৩০-রূম: ২৫) আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে , আকাশ ও পৃথিবী তাঁর হুকুমে
প্রতিষ্ঠিত আছে৷................২৬) আকাশসমূহ ও পৃথিবীর মধ্যে যা কিছুই আছে সবই
তাঁর বান্দা , সবাই তাঁর হুকুমের তাবেদার৷
৩৬ . অর্থাৎ তাঁর হুকুমে একবার অস্তিত্ব লাভ করেছে শুধু
এতটুকু নয় বরং তাদের সবসময় প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং তাদের
মধ্যে একটি বিশাল নির্মাণ কারখানায় প্রতিনিয়ত সচল থাকাও তাঁরই হুকুমের বদৌলতে সম্ভব
হয়েছে। এক মুহূর্তের জন্যও যদি তাঁর হুকুম তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত না রাখে, তাহলে এ সমগ্র ব্যবস্থা এক
নিমিষেই ওলট পালট হয়ে যাবে।